রবিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

খুলনা অঞ্চলে কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক দামের কারণে পাটকলের উৎপাদন বন্ধ

খুলনা অঞ্চলের ইজারা ও বেসরকারি পাটকলগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত হয়ে গেছে কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে। উচ্চ বাজারমূল্য ও উৎপাদন খরচের কারণে অনেক মিল তাদের পাটপণ্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এতে হাজারো শ্রমিকের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে, পাশাপাশি মিলগুলোর আর্থিক লোকসান ও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

দৌলতপুরের দৌলতপুর জুট মিল গত দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রাখে, শ্রমিকরা অকেজো দিন কাটাচ্ছেন। একই পরিস্থিতি অনেক মিলের। কিছু মিল সীমিত কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, তবে বেশিরভাগই বন্ধ বা স্থবির। শ্রমিকরা আশঙ্কা করছেন, যদি পরিস্থিতি এমনই চলতে থাকলে তারা দীর্ঘমেয়াদে কাজ হারাতে পারেন।

দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিক আসাদুজ্জামান বলেন, আমি গত এক দেড় মাস ধরে মিলের কাজে যোগদান করছি, কিন্তু এখন পুরোপুরি বন্ধ। কাঁচা পাটের অভাবে মালিক মিল চালাতে পারছেন না। যদি এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আমাদের কাজ থেকে ছাটাই হয়তে পারে, আর তা হলে আমরা কীভাবে পরিবার চলে Cheryl? তিনি বললেন, “নতুন কাজের সন্ধানে থাকলেও পরিস্থিতি অনেকটাই অন্যরকম।”

অন্য একজন শ্রমিক হাবিবুল্লাহ বলেন, “আমরা যখন কাজ করি, তখন মালিক ২ টাকা উপার্জন করে, আর আমাদের পাই মাত্র এক টাকা। গত তিন বছর মিলটি ভাল চললেও, এখন দেড় মাস ধরে আমরা অনুপস্থিত। মালিকেরা বলছেন, যদি না কিনতে পারে কাঁচা পাট, তবে মিল চালানো সম্ভব নয়।”

বিস্তারিত জানা গেছে যে, মৌসুমের শুরুতে কাঁচা পাটের দাম ছিল মণপ্রতি প্রায় ৩২০০ টাকা, এখন তা বেড়ে ৫২০০ টাকায় পৌঁছেছে। দাম দ্বিগুণের মতো বেড়ে গেলেও বাজারে প্রেরিত পণ্যের মূল্য সেই অনুযায়ী বৃদ্ধি পানি। ফলে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে, উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

দৌলতপুর জুট মিলের উৎপাদন কর্মকর্তা মোঃ ইসরাফিল মলিকে বলেন, “প্রথমে ৩২০০ টাকা দরে পাট কিনে আমাদের প্রতিটি বস্তা বিক্রি করতাম ৮০ টাকায়। শেষ পর্যন্ত ৪০০০ টাকায়ও কিনতে হয়েছে, কিন্তু লাভের অংক খুবই কম। এখন পাটের দাম ৫২০০ টাকা হওয়ার পর, এক বস্তার জন্য খরচ হয় এইচ ১২০ টাকার বেশি, যেখানে বিক্রয়মূল্য কম। ফলে মিল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছি।”

তিনি অভিযোগ করেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কিছু সিন্ডিকেটকারী ব্যবসায়ী পাট মজুত করে দাম বাড়াচ্ছে। তিনি বলছেন, “সরকার যদি না দেখবে তাহলে এই খাতের দুর্দশা আরও বাড়বে।”

বাজারের এই পরিস্থিতির জন্য শ্রমিকদের পাশাপাশি মিল মালিকরাও উদ্বিগ্ন, যারা বলছেন বাজার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি জরুরি। বাংলাদেশ জুট মিল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মোঃ জহির উদ্দিন জানান, “অসাধু অবৈধ মজুতদাররা পাটের দাম বাড়ানোর জন্য বাজার অস্থির করে তুলেছে। এ ছাড়াও, ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত, যা এই শিল্পের উপর চাপ বৃদ্ধি করছে। সরকারের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।”

পাট অধিদফতর জানিয়েছে, তারা বাজারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। খুলনা অঞ্চলের সহকারী পরিচালক সরজিত সরকার বলেন, “আমরা নিয়মিত তদারকি করছি, একজন আড়তদার বা ডিলার এক মাসে সর্বোচ্চ ৫০০ মণ পাট মজুত রাখতে পারবেন। অতিরিক্ত মজুত ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মূল লক্ষ্য, বাজারে পণ্য সরবরাহ ও দামের রক্ষণাবেক্ষণ।”

খুলনা অঞ্চলে মোট ২০টি পাটকল রয়েছে, যেখানে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন পাট ও পণ্য উৎপাদিত হয়, যা বেশিরভাগই বিদেশে রফতানি হয়। তবে বর্তমানে চলমান সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে, উৎপাদন ও রফতানি দুটিই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।