ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ড্রোন ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগে এক মার্কিন নাগরিক ও ছয় ইউক্রেনীয়কে গ্রেপ্তার করেছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)। এই ঘটনার তথ্য তদন্তকারীদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজর কাড়ছে।
গ্রেপ্তারকৃত মার্কিন নাগরিক ম্যাথিউ অ্যারন ভ্যানডাইককে কলকাতা থেকে ধাওয়া করে আটক করা হয়। অন্যদিকে ছয় জন ইউক্রেনীয় নাগরিকের মধ্যে তিনজনকে লখনৌ থেকে এবং তিনজনকে দিল্লি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এনআইএ তাদেরকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টে হাজির করে।
মিডিয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যানডাইকের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা প্রশিক্ষণ প্রদানের, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ভ্যানডাইক নিজেকে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, যুদ্ধ সংবাদদাতা ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি ২০১১ সালের লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পান এবং পরে ‘সনস অব লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল’ (এসওএলআই) নামে একটি সংগঠনও গঠন করেন। এই সংগঠনটি ঘিরে আন্তর্জাতিক সঙ্ঘাতে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত পরামর্শ দেয়ার সর্বস্বতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এনআইএ তদন্তের অংশ হিসেবে যে কয়েকটি ধারনা উঠে আসছে তার মধ্যে রয়েছে—কিছু ইউক্রেনীয় পর্যটক ভিসায় ভিন্নভিন্ন সময়ে ভারতে প্রবেশ করেছে, তারা প্রথমে গুয়াহাটিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি ছাড়াই মিজোরামে পৌঁছেছে এবং তারপর অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে ঢুকেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের উদ্দেশ্য ছিল মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ড্রোন যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া, যা পূর্বেই পরিকল্পিত ছিল।
তদন্তকারীরা বলছেন, ইউরোপ থেকে ড্রোনের একটি বড় চালান ভারত হয়ে মিয়ানমারে পাঠানো হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে এবং তা ওই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহারেই যাবে। এছাড়া মিয়ানমারে সক্রিয় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ভারতের নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর যোগাযোগ রয়েছে—এদের মাধ্যমে অস্ত্র, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদি এসব প্রমাণিত হয়, তবে তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে।
এনআইএকে গ্রেপ্তারের পর ১৫ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করলেও আদালত ১১ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তদের যাতায়াতের রুট শনাক্ত, ষড়যন্ত্রের প্রমাণ সংগ্রহ এবং অন্যান্য সহযোগীদের খোঁজ করা হবে। সূত্র জানিয়েছে আগামী ২৭ মার্চ তাদের আবার আদালতে তোলা হবে।
গ্রেপ্তারের সময় জব্দ করা মোবাইল ফোন ও অন্যান্য জিনিসপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, অর্থের লেনদেন এবং ড্রোন আনা-পরিবহনের ধরন খতিয়ে দেখছেন। তারা একই সঙ্গে খোঁজ করছেন—ভারতের ভেতরে এই নেটওয়ার্কের কোনো স্থানীয় সংযোগ আছে কি না এবং ভূখণ্ড ব্যবহার করে কিভাবে ড্রোন পাঠানো হচ্ছিল।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মার্চে মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন যে বিদেশি স্পেশাল ফোর্স সদস্য ও ভাড়াটে যোদ্ধারা মিজোরাম হয়ে মিয়ানমারে প্রবেশ করে স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। বর্তমান গ্রেপ্তার ও তদন্ত সেই সতর্কবার্তাকে ফেরোত দিয়েছে এবং এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে নতুন প্রশ্ন খুলে দিয়েছে।
এনআইএ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তদন্তে তৎপর রয়েছেন। তারা বলছে—যতই তদন্ত এগোবে, ততই ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে এবং প্রয়োজন পড়লে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও পাচার রুট নিয়ে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে।





