শনিবার, ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঈদে আল-আকসা বন্ধ: ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের শোকের দিন

পবিত্র আল-আকসা মসজিদ জেরুজালেমের সবচেয়ে সংবেদনশীল ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর একটি। কিন্তু চলতি বছরের রমজানের শেষ দিকে—১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো—এই মসজিদটি বন্ধ রাখা হয়। ফলে ঈদুল ফিতরের দিন অনেক মুসল্লিই মসজিদের ভেতরে নামাজ আদায় করতে পারেননি এবং কাছাকাছি খোলা জায়গায় নামাজ পড়তে বাধ্য হয়েছেন।

স্থানীয় সংবাদসূত্র বলছে, শুক্রবার (২০ মার্চ) সকালে ওল্ড সিটি জেরুজালেমের বাইরে শত শত মানুষ নামাজ আদায় করেছেন। ইসরাইলি পুলিশ মসজিদে প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দেয়ায় তারা পুরান শহরের গেটের বাইরে নামাজ পড়ার চেষ্টা করেন।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে। সেই যুক্তি দেখিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরো রমজানের বেশিরভাগ সময়ে মসজিদসংলগ্ন এলাকা কার্যত অনেক মুসল্লির জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পুরনো শহরের বাইরে নামাজ আদায় করতে বাধ্য হয়েছেন।

ফিলিস্তিনিরা এই সিদ্ধান্তকে কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন না; তারা মনে করেন এটি একটি কৌশলের অংশ—উত্তেজনাকে অজুহাত করে আল-আকসা কমপ্লেক্সে নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া করার চেষ্টা হচ্ছে। আল-হারাম আল-শরিফ নামে পরিচিত এই স্থানে ডোম অব দ্য রকসহ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ভবনগুলো অবস্থিত। অন্যদিকে ইহুদিদের কাছে এটা টেম্পল মাউন্ট নামে পরিচিত, যেখানে প্রাচীন প্রথম ও দ্বিতীয় মন্দির ছিল।

জেরুজালেমের মুসলিম অধিবাসীদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ৪৮ বছর বয়সি হাজেন বুলবুল বলেন, “এবারের ঈদ আমাদের জন্য সবচেয়ে দুঃখের দিন। এটা ভবিষ্যতের জন্য খারাপ নজির তৈরি করেছে।” তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ জেরুজালেমে বেড়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুরনো শহরে ফিলিস্তিনি মুসল্লি ও ধর্মীয় কর্মীদের গ্রেফতার বেড়েছে। একই সঙ্গে কিছু ইসরায়েলি বসতকারীর মসজিদ এলাকায় অনুপ্রবেশের অভিযোগও উঠেছে। নামাজের সময় বহুজনকে আটক করা হয়েছে এবং অনেক ফিলিস্তিনি মসজিদে ঢুকতে বাধা পেয়েছেন। সাধারণত ঈদের সময় ওল্ড সিটির ভিড় থাকে; কিন্তু এবার পুরোটাই প্রায় ফাঁকা ছিল। দোকানপাটও অধিকাংশ বন্ধ ছিল—শুধু ওষুধ ও প্রয়োজনীয় খাবারের দোকান খোলা ছিল—এতে ব্যবসায়ীদের বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

আল-আকসার খতিব ও সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি একরিমা সাবরি ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের অনুরোধ করেছেন, মসজিদে ঢুকতে না পারলে যারা পারেন, তারা কাছাকাছি জায়গায় ঈদের নামাজ আদায় করুন। তবে পুরান শহরের ভেতরে কড়া নিরাপত্তা ও তল্লাশির কারণে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আল-আকসা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আরব লীগ, বলেছেন এটি আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি) ও আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনও একইভাবে নিন্দা জানিয়েছে এবং জানিয়েছে, রমজানের মতো পবিত্র সময়ে মসজিদ বন্ধ করা মুসলিম বিশ্বের অনুভূতিতে গভীর আঘাত করে—এটি চললে সহিংসতা ও উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আল-কুদস ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট অফিসের মিডিয়া ইউনিটের পরিচালক খলিল আসালি বলেন, আল-আকসা বন্ধ করা ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বড় বিপর্যয়। তিনি জানান, অনেক তরুণ যখন মসজিদের যতটা সম্ভব কাছাকাছি গিয়ে নামাজ পড়ার চেষ্টা করেন, তখন ইসরায়েলি বাহিনী তাদের ধাওয়া করে এবং নামাজরত অবস্থাতেই সেখান থেকে বের করে দেয়।

অন্যদিকে গাজা উপত্যকায় মানুষদের দৈনন্দিন জীবন যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের ছায়ায় কাটছে। রমজানের শেষে ঈদ উদযাপনের সময় গাজার অনেক শহর ধ্বংসস্তূপে ঘেরা রয়েছে। ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ থামায়নি; ফলে বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ঈদ পালন করছেন।

উত্তর গাজার ৩২ বছর বয়সি বাসিন্দা সাদিকা ওমর দেইর আল-বালাহে বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, “ঈদের আনন্দ অসম্পূর্ণ—অনেকেই বাড়ি বা পরিবার হারিয়েছে। আমার স্বামী দূরে, গাজায় ফিরতে পারেননি। তবু আমরা চেষ্টা করি ধর্মীয় রীতি মেনে কিছু আনন্দ টুকু ধরে রাখার।” খান ইউনিসে আশ্রয় নেয়া ৪৯ বছর বয়সি আলা আল-ফাররা বললেন, “বিগত বছরেই আমরা আল-ক্বারারা থেকে বিতাড়িত হয়েছি। চলমান হামলার কারণে চলাফেরা সীমিত—এই ঈদও অনেকটা সীমাবদ্ধ।”

যুদ্ধের মহামায়ার মধ্যে সীমিতভাবে কিছু ঐতিহ্য ফিরছে—ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে ছোট চুলায় কায়েক ও মামুলের সুগন্ধ ফেলা হচ্ছে, বাজারে মিষ্টি দেখা গেলেও সবার নাগালের বাইরে। ছোট ছোট কেনাকাটা করে শিশুরা সামান্য খুশি উপভোগ করছে।

কয়েকদিন বন্ধ থাকার পরে গত ১৯ মার্চ গাজার দক্ষিণে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেয়া হয়; এতে জাতিসংঘের একটি কনভয় গাজায় প্রবেশ করতে পেরেছে। তবু ঈদের আনন্দ অসম এবং অনেকে এখনও নিরাপত্তাহীনতা ও স্মৃতির ভারে সীমিত উদযাপন করছেন। গাজার অনেক পরিবারের জন্য ক্ষতি ও শোক এখনও পাশ কাটানো যায়নি—অনেকে নিহত আত্মীয়দের শোক পালন করছেন, আর আনেকেই স্মৃতির ওপর ভর করে দিন কাটাচ্ছেন।

এই প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।