পবিত্র আল-আকসা মসজিদ, যা জেরুসালেমের মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ন স্থান, রমজানের শেষ দিকে প্রথমবারের মতো ১৯৬৭ সালের পর এভাবে জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ রাখা হলো। ঈদুল ফিতরের দিনে মসজিদে প্রবেশ বন্ধ থাকায় বহু মুসল্লি নামাজ আদায় করতে না পেরে মসজিদের কাছাকাছি উন্মুক্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছেন।
স্থানীয়সংবাদমাধ্যম জানায়, আজ শুক্রবার (২০ মার্চ) সকালে ওল্ড সিটি জেরুসালেমের বাইরে শত শত মানুষ বাধ্য হয়ে নামাজ আদায় করেছেন। ইসরায়েলি পুলিশ মসজিদে প্রবেশের সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিল।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় এনে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে পুরো রমজান জুড়ে বেশিরভাগ মুসল্লির জন্য মসজিদ এলাকা কার্যত সীমিত রাখা হয়েছে। তবে ফিলিস্তিনিরা এটিকে কেবল ‘নিরাপত্তা’ বলে দেখেন না। তাদের অভিযোগ, উত্তেজনার অজুহাতে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর একটি কৌশল চলছে এবং আল-আকসা কমপ্লেক্সে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আল-হারাম আল-শরিফ বা টেম্পল মাউন্ট—এই নামেই মুসলিম ও ইহুদিদের কাছে পরিচিত ঐ এলাকা—ডোম অফ দ্য রকসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে গঠিত। সেই এলাকায় প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ হওয়ায় জেরুসালেমের মুসলিমদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
৪৮ বছর বয়সী জেরুসালেমবাসী হাজেন বুলবুল বলেন, “এবারের ঈদ আমাদের জন্য সবচেয়ে দুঃখের দিন হবে।” তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এটি একটি খারাপ নজির তৈরি করেছে — ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা বেড়ে যেতে পারে।” তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে জেরুসালেমে ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ অনেক বেড়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুরোনো শহরে বহু ফিলিস্তিনি মুসল্লি ও ধর্মীয় কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি বসতকারীরা বারবার মসজিদ এলাকা প্রদক্ষিণ করছে এবং নামাজের সময়ও অনেককে আটক করে মসজিদে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। সাধারণত ঈদের আগে ওল্ড সিটি জেরুসালেমে ভিড় থাকলেও এবার পুরো এলাকা প্রায় ফাঁকা ছিল; দোকানপাটও প্রায় বন্ধ ছিল—শুধু ওষুধ ও প্রয়োজনীয় খাবারের দোকান খোলা ছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে তাদের বড় ধরণের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
আল-আকসার খতিব ও সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ইক্রিমা (একরিমা) সাবরি মুসলিমদের আহ্বান জানিয়েছেন—যদি মসজিদে ঢুকতে না পারেন তা হলে কাছাকাছি নিরাপদ কোনো স্থানে যতটা সম্ভব ঈদের নামাজ আদায় করুন। তবে পুরোনো শহরের ভিতরে কড়া নিরাপত্তা, তল্লাশি ও সম্ভাব্য সংঘর্ষের কারণে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আল-আকসা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আরব লীগ। তারা বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত। একইভাবে ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন) ও আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনও এই পদক্ষেপ নিন্দা জানিয়েছে এবং সতর্ক করেছেন, এমন চলতে থাকলে সহিংসতা বাড়তে পারে ও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিপন্ন হতে পারে।
আল-কুদস ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্সিয়াল মিডিয়া ইউনিটের পরিচালক খলিল আসালি এই পরিস্থিতিকে ‘ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বড় বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, অনেক তরুণ আল-আকসার কাছে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করলে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের ধাওয়া করে এবং নামাজরত অবস্থাতেই তাদের জায়গা থেকে তুলে দেয়।
অন্যদিকে গাজা উপত্যকায় জীবন যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের ছায়ায় কেটে যাচ্ছে। রমজান শেষে যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমাণরা ঈদ উদযাপন করছেন, তখন গাজায় বহু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত। বোমাবর্ষণ থেমে না যাওয়ায় বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ঈদ পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
৩২ বছর বয়সী সদিকা ওমর, যিনি উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে দেইর আল-বালায় আশ্রয় নিয়েছেন, বলেন, “ঈদের আনন্দ অসম্পূর্ণ। প্রত্যেকেরই কষ্ট আছে—কেউ বাড়ি হারিয়েছে, কেউ পরিবার। আমার স্বামী দূরে থাকায় গাজায় ফিরতে পারেনি। তবু আমরা চেষ্টা করি ধর্মীয় নিয়ম মেনে ঈদে কিছু আনন্দ দেখানোর।” খান ইউনিসে আশ্রয় নেয়া ৪৯ বছর বয়সী আলা আল-ফাররা বলেন, “যুদ্ধের প্রথম বছর রমজানে আমরা আল-ক্বারারা থেকে বিতাড়িত হয়েছি। চলমান হামলার কারণে চলাফেরা সীমিত, তাই ঈদ এবারও খুব সীমিত।”
যুদ্ধের মধ্যেও কিছু ঐতিহ্য সীমিতভাবে ফিরছে—ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে ছোট চুলায় কায়েক-ও মামুলের গন্ধ মিশে যায়; বাজারে রঙিন মিষ্টি দেখা গেলেও অনেকের কাছে পৌঁছায় না। অনেকেই সামান্য জিনিসও হাতে পেয়ে সন্তুষ্ট থাকে; বাবা-মা ছোটখাটো কিছু কিনে শিশুর মুখে সামান্য হাসি ফুটানোর চেষ্টা করেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রাফা সীমান্ত ক্রসিং কিছুদিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় খোলা হয়। ওই সময় একটি জাতিসংঘ কনভয় গাজায় প্রবেশ করে—যা ইস্যুটির পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবুও ধ্বংস ও সংকটের কারণে ঈদের আনন্দ অসমভাবে ছড়িয়েছে। গাজা সিটি থেকে ৪২ বছর বয়সী খলুদ বলেন, “যুদ্ধবিরতির পর আপাতত কিছুটা নিরাপত্তা ফিরে এসেছে, কিন্তু যথেষ্ট নয়। গত সপ্তাহেই আমাদের এলাকায় বিমান হামলার প্রস্তুতিতে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে—ইফতারের কাছে আমরা দ্রুত ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছি।”
সবমিলিয়ে, আল-আকসা মসজিদের প্রবেশ নিষেধ ও গাজায় চলমান সংঘাতের কারণে ফিলিস্তিনিদের জন্য এবারের ঈদ দুঃখ, অনিশ্চয়তা ও শোক দিয়ে ভরা ছিল। (দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে সংকলিত)





