শনিবার, ২৮শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চিটলমারীতে সংঘর্ষ পরবর্তী সন্ত্রাস: অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে ৪০ ঘর-দোকান ধ্বংস, নিহত ১

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চিংগড়ী গ্রামে জমি ও আধিপত্য নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিশ্বাস ও শেখ নামের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের পর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হামলা-অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় অন্তত ৪০টি বসতবাড়ি ও দোকান ভস্মীভূত হয়েছে। ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন রাজিব শেখ (২৫), আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, গত ২৬ মার্চ বিকেল সাড়ে ৬টার পর চিতলমারী-পাটগাতি সড়কের চিংগড়ী ও মচন্দপুর এলাকার মাঝে তখনই উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। সন্ধ্যার দিকে এক যুবক আরিফ শেথকে (স্থানীয়) বিশ্বাস পরিবারের লোকজন ‘ফুলকুচি’ দিয়ে আঘাত করার অভিযোগ ওঠে। ফুলকুচি বলতে এখানে লোকালভাবে ব্যবহৃত লোহার হ্যান্ডেলযুক্ত মাছ ধরার অস্ত্র বোঝানো হয়েছে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুইপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয় এবং রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, পুলিশ পাশে থাকা অবস্থায় কাজে লাগিয়ে সাইদ বিশ্বাস ও সোহাগ মেম্বরের নেতৃত্বে সয়লাব সশস্ত্র গ্রুপ সেখানে ঢুকে ২০০-র বেশি লোককে সামনে রেখে শেখ পরিবারকে লক্ষ্য করে লুটপাট, ভাঙচুর ও বনভূমি কাঁচামাল-ভিত্তিক পেট্রোল ও পিচ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। একাধিক বাড়ি একে একে পুড়ে যায়; অনেক বাড়ি সম্পূর্ণ জমি ঝড়ে বিলীন হয়েছে, আবার অনেকে আংশিকভাবে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুপুর পর্যন্ত এলাকায় থেমে থেমে গুমোট শব্দ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে, স্থানীয়রা আবারও নতুন হামলার ভয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে শুরু করেছেন।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় ঝাঁঝালো পোড়ার গন্ধ, ইট-ফোটা এবং ছাই মিশ্রিত ময়লা। শহরের বাইরে থাকা অনেক মানুষ ছুটে এসে নিজেরা পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ দেখছেন; কেউ কেউ হাতের উপর মাথা তুলে বসে কাঁদছেন। নিহত রাজিব শেখের পরিবারের পাশে দুটি বড় চৌকি বসিয়ে সবাই মিলে রান্না করে খাচ্ছেন। বেশিরভাগ পরিবারের শেষ সম্বলও নষ্ট হয়েছে; ঘরে চাল-আটা, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার পুড়ে বা লুটপাটে চলে গেছে বলে অভিযোগ আসে। অনেক বাড়িতে বৈদ্যুতিক খুঁটি পুড়ে যাওয়ার কারণে বিদ্যুৎও বিচ্ছিন্ন।

ক্ষতিগ্রস্ত লিয়াকত শেখ বলেন, “আমার সব শেষ করে দিয়েছে, কী খাবো বা কী করবো জানি না। আমাদের কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। আমার ছেলে-কে বা আমায় কোনো কাউকে কেন এমন করার দরকার?” মনোয়ারা বেগম বলেন, “স্বামী প্যারালাইজড অবস্থায় শুয়ে আছেন। ছোট ছেলে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছি। ঘরে ঋণে কেনা ছয় মাসের ধানও পুড়ে গেছে।” জয়নব বেগম নামে এক নারী বলেন, ঘর ঠিক করার জন্য করা ৫০ হাজার টাকার ঋণ এখন হাতছাড়া, এক ছাগল ও কিছু হাঁস-ভরে ছিল, সেগুলোও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে; হামলাকারীদের বিচার ও ঘরাবাড়ি ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন তিনি।

অন্যদিকে হামলাকারীর সংখ্যা ও সংগঠিত কাজের বিষয়েও ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেন; মোঃ বাবলু শেখ বলেন, “ওরা অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে একযোগে এসে আমাদের ঘরে আগুন দিয়েছে। পুলিশ এসআই নুরে আলম দাবি করে আমাদের লোকজনকে পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করেছে এবং পুলিশের সামনেই আগুন ছুঁড়েছে।” এ দাবির বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে অবস্থানকারী একাধিক সদস্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছেন; অভিযোগের তদন্ত চলছে।

ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতের নাম সৌরভ বিশ্বাস (১৯), তিনি মচন্দপুর গ্রামের সোহেল বিশ্বাসের ছেলে। নিহত রাজিব শেখ চিংগড়ী গ্রামের ফারুক শেখের ছেলে। বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোঃ শামীম হোসেন বলেন, অনেক বসতবাড়ি ও দোকানে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে; নিহত রাজিবের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অভিযান জোরদার করে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে এবং পুনরায় সংঘর্ষ এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে।

চিতলমারী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার আব্দুল ওয়াদুদ জানান, খবর পেয়ে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও বাধার মুখে আগুন নেভাতে কিছুটা দেরি হয়েছে। আনুমানিক ২০-২৫টি বসতঘর পুড়ে গেছে বলে তারা ধারণা করছেন; ফায়ার ইউনিট চারটি একযোগে কাজ করে প্রায় তিন ঘণ্টা লড়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

স্থানীয়রা বলছেন, মধুমতী নদীর চরভূমি দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শেখ-মানুষ ও বিশ্বাস পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলছে; পূর্বে এই বিরোধে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ দুই পরিবারের বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে শান্তি ফেরাতে প্রশাসনকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ ও অনিশ্চিত; স্থানীয়রা দ্রুত বিচারের দাবি করছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন।