শুক্রবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইরানের অবরোধে উপসাগরে আটকা পড়েছে ২,১৯০ জাহাজ

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে আরব উপসাগরে অন্তত ২,১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছে। বুধবারের এই পরিস্থিতিতে আটকা পড়া জাহাজগুলোর মধ্যে ৩২০টিরও বেশি তেল ও গ্যাস ট্যাংকার রয়েছে।

নৌ পরিবহন বিশ্লেষকরা বলছেন, আটকা পড়া জাহাজগুলোর মধ্যে ১২টি অত্যন্ত বড় গ্যাসবাহী জাহাজ এবং ৫০টি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজও আছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলার জানিয়েছে, মঙ্গলবার ও বুধবার মিলিয়ে মাত্র ছয়টি জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করতে পেরেছে — সাধারণত এই পথে একদিনে প্রায় ১২০টি জাহাজ চলাচল করে।

যেগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে, সেগুলোকে ইরানের উপকূলের কাছে লারাক দ্বীপের একটি নির্ধারিত করিডোর দিয়ে পাঠানো হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে অন্তত ৪৮টি জাহাজ ওই করিডোর ব্যবহার করেছে; ওইগুলোর বেশিরভাগ ইরান বা তেহরানের মিত্র দেশগুলোর সম্পদ বলে জানানো হয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পরে ইরান এই নৌ পথে কঠোর নিয়ন্ত্রণ চালু করেছে — পার্থক্য এই পথের মাধ্যমে বিশ্বের আনুমানিক ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। যেসব জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেয়া হচ্ছে তাদের থেকে ইরান ২০ লাখ ডলার (প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত শুল্ক আদায় করছে — এটাই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ‘তেহরান টোল বুথ’ হিসেবে পরিচিত। যদিও তেহরান মালয়েশিয়া ও কিছু মিত্র দেশের জাহাজের ক্ষেত্রে এই মাশুল মওকুফ করার কথা ইঙ্গিত দিয়েছেন।

মালয়েশিয়া জানিয়েছে, পেট্রোনাস, সাপারা এনার্জি এবং এমআইএসসি-র মালিকানাধীন কয়েকটি ট্যাংকার চলাচলের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। কুয়ালালামপুরকে তেহরান আশ্বস্ত করেছে যে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক থাকা স্বত্ত্বেও তাদের জাহাজে টোল আরোপ করা হবে না, তবে বৈধতার অপেক্ষায় নোঙর করে থাকা জাহাজের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিলম্ব ঘটতে পারে।

চীন জানিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট পক্ষদের সঙ্গে সমন্বয়ের পর তাদের অন্তত তিনটি জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করতে পেরেছে। জাহাজ-ট্র্যাকিং ডেটায় দেখা গেছে, দুইটি কন্টেইনার জাহাজ উপসাগর ছেড়েছে—বিশ্লেষকরা বলছেন, সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটি প্রথমবার কোনো ইরানি নয় এমন কন্টেইনার জাহাজের প্রস্থান।

আরও কিছু জাহাজ বের হতে পেরেছে; এর মধ্যে রয়েছে ভারতের হয়ে চলাচলকারী একটি গ্রিক পরিচালিত অপরিশোধিত তেল ট্যাঙ্কার এবং জরুরি সরবরাহ বহনকারী কয়েকটি ভারতীয় পতাকাবাহী এলপিজি ট্যাংকার। তবে মাইন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অনেক নাবিক রাতে জাহাজ চালানো বা ট্র্যাকিং ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করার মতো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

ইরানের এই বিরোধের কারণে সৌদি আরব ও কাতারসহ প্রধান জ্বালানি উৎপাদকদের রফতানি কার্যত স্থবির রয়েছে; শত শত জাহাজ ও আনুমানিক ২০,০০০ নাবিক উপসাগরে বা তার আশেপাশে আটকে আছেন। পাকিস্তানের একটি তেলবাহী জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করে করাচিতে পৌঁছেছে এবং আরেকটি বিকল্প পথে বন্দরে এসেছে; দেশটির কর্মকর্তারা বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও চালান আসার আশা রয়েছে।

এই সংকট আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। ব্রিটেন প্রায় ৩৫টি দেশের সঙ্গে নৌ চলাচল অব্যাহত রাখার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে চীন ও পাকিস্তান অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে এবং সব পক্ষকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপদ পথ নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার তেহরানকে অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং না মানলে কড়া সামরিক পদক্ষেপের সতর্কতা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন কৌশলগত এই জলপথে বাণিজ্য সচল রাখতে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক সমাধান খুঁজছে।