বৃহস্পতিবার, ৯ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

২০২৪ সালে দেশের ব্যাংক খাতে লোকসান ও সিএসআর ব্যয়ের সংকোচন

২০২৪ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য ছিল চ্যালেঞ্জের এক কঠিন বছর। আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি ও নানা অস্থিরতার কারণে, স্বাভাবিক মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে ১৭টি ব্যাংক। এছাড়াও, অন্য ব্যাংকগুলোও প্রত্যাশিত মাত্রায় লাভ করেনি। এর প্রভাব পড়ে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে, যেখানে ব্যয় অর্ধেকে নেমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরে ব্যাংকগুলো এই খাতে দুই শঙ্কা পূর্ণ সূচক দেখিয়েছে।

২০২৫ সালে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর), দেশের ৬১টি ব্যাংক মোটক্ষেত্রে মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪২ শতাংশ কম। এটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যয়ের রেকর্ড। এর আগে ২০১৫ সালে সর্বনিম্ন আকারে এই খাতে ব্যয় হয়েছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এই কমতির হার অনেক বেশি, যা খাতটিতে নতুন নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সিএসআর খাতে ব্যয় হয়েছে মোট ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩০৮ কোটি টাকা বা ৩৩ শতাংশ কম। ২০২৩ সালে এই ব্যয় ছিল ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, আর ২০২২ সালে ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, দুই বছরে এই খাতে ব্যয় কমে গেছে মোট ৫১৩ কোটি টাকা, যা ৪৫ শতাংশের বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই সংকুচিত ব্যয়ের বড় কারণ। ২০২৪ সালের জুন-জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরকার পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা দেয়। পাশাপাশি, একাধিক ব্যাংকের অনিয়ম ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত খবর প্রকাশের মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক চিত্রটি প্রকাশ পায়। বিশেষ করে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো কঠিন চাপের মুখে পড়ে, যেখানে ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের ঘটনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে, দুর্বল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার একাধিক ব্যাংকের সংহতকরণে উদ্যোগ নেয়।

ব্যাংকাররা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সিএসআর ব্যয়ের এই সংকোচনের পেছনে বড় একটি কারণ হচ্ছে। আগে বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের চাপ থাকত, যাতে ব্যাংকগুলোকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি বা অন্য খাতে অনুদান দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই ব্যয় প্রকৃত সিএসআর এর আওতায় পড়ত না। তবে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলন ও পরে সরকার পরিবর্তনের ফলে এই চাপ অনেকটাই কমে গেলে, ব্যাংকগুলো এখন বিবেচনা করে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করছে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এই ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক প্রভাব বা চাপের কারণে অনেক সময় এই অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়, যা মূল লক্ষ্য—সামাজিক দায়বদ্ধতা—কে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো তাদের নিট লাভের একটি নির্দিষ্ট অংশ সিএসআর খাতে খরচ করতে বাধ্য। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ ব্যয় হতে হবে শিক্ষা খাতে, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে এবং ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়। বাকি ২০ শতাংশ খরচ করা যাবে অন্যান্য দিকে।

তবে বাস্তবে দেখা যায়, এই নির্দেশনা যথাযতভাবে মানা হয়নি। ২০২۵ সালে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ৩৬ শতাংশ ব্যয় করেছে ‘অন্যান্য’ খাতে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ে সামান্য কিছু হয়েছে, আর পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। এগুলো হলো-জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশের কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

এছাড়াও, এই বছর লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে আছে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশের কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামিক ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংক মুনাফা না করেও সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করেছে, যেমন- এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামিক ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। সকলেই বিভিন্ন শঙ্কা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই বছরগুলোতে।