শনিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৮ মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দ্বিগুণ: দুই লাখ কোটি টাকার ওপরে

চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে বাংলাদেশে পণ্যের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৬৯১ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার ওপরে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১,৩৭১ কোটি ডলার। এসব তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) হালনাগাদ প্রতিবেদন।

প্রধান কারণগুলোতে রয়েছে আমদানি বৃদ্ধি ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে দেশের আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪,৬১৭ কোটি ডলার (প্রায় ৪৬.১৪ বিলিয়ন ডলার), যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি ছিল প্রায় ৪৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে পণ্য রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০.০৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ২৯.২৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় মোটামুটি স্থিতিশীল—আনুমানিক ২.৬ শতাংশ অনুকূল পরিবর্তন। অর্থাৎ রপ্তানির প্রবৃদ্ধি আমদানির বৃদ্ধিকে ধরতে পারেনি; ফলে পণ্যের বাজারে এই স্বল্পতার কারণে সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বাড়ায় সার্বিক আমদানিই বেড়ে যায়। একই সময়ে রপ্তানি আয় ততোটা দ্রুত বাড়েনি—এই ছেদই বাণিজ্য ঘাটতির প্রধান কারণ বলে তারা মনে করছেন। তাদের পরামর্শ, দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বুস্ট করার ওপর জোর দিতে হবে।

চলতি হিসাব-অবস্থা (কারেন্ট একাউন্ট) বর্তমানে সামান্য ঋণাত্মক; ফেব্রুয়ারি শেষে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১০০ মিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ১৪৭ মিলিয়ন ডলার। তবে সমগ্র আর্থিক বিনিময়ের ওপর নেগেটিভ প্রভাব পড়লেও ওভারঅল ব্যালান্স উন্নত অবস্থায় আছে—আলোচিত সময়ের সামগ্রিক লেনদেন (ওভারঅল ব্যালান্স) ছিল ৩৪৩ মিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছর একই সময়ে এটি -১১৫ মিলিয়ন ডলার (ঋণাত্মক) ছিল।

রেমিট্যান্সও বৃদ্ধি পেয়েছে: অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ২,২৪৫ কোটি ডলার (প্রায় ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার) রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের ১,৮৮৭ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় ২১.৪ শতাংশ বাড়তি।

প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ঘাটতি বা উত্থান-পতন দেখিয়েছে—গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে এফডিআই ছিল ১০৬ কোটি ডলার, কিন্তু চলতি সময়ে তা নামিয়ে এসেছে ৮৭ কোটি ডলারে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ নিট হিসেবে নেতিবাচক অবস্থায় আছে; চলতি অর্থবছরে শেয়ারবাজারে বাইরের বিনিয়োগে নেট আউটফ্লো প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছরের সমপরিমাণ নেতিবাচকের কাছাকাছি অবস্থানই নির্দেশ করে।

সংক্ষেপে বলা যায়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ আমদানির তীব্রতার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। নীতিনির্ধারকরা আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি বাড়ানো ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার পরামর্শ দিচ্ছেন, অন্যথায় অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে।