সোমবার, ১৩ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দুই লাখ কোটি টাকার ওপরে

চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে রপ্তানির তুলনায় আমদানির দ্রুত বৃদ্ধির কারণে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বৃদ্ধিপেতে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৯১ কোটি ডলারে — যা বাংলাদেশি টাকায় দুই লাখ সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭১ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (বিওপি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই চিত্রটি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল কারণ হলো জ্বালানিসহ বেশিরভাগ পণ্যের বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং বিশেষ করে রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানির তীব্র উত্থান। ফলে সামগ্রিক আমদানির পরিমাণ দ্রুত বাড়লেও রপ্তানি আয় সেই তুলনায় ধীর গতিতে বাড়েছে বা স্থিতিশীল থেকেছে, ফলে ঘাটতি বড় হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যায়ে দেশের ব্যবসায়ীরা মোট প্রায় ৪,৬১৭ কোটি ডলার (প্রায় ৪৬.১৭ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের পণ্য আমদানি করেছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। এই সময়ের পণ্য রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩০.০৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩,০০৩ কোটি ডলার), যা আগের বছরের ২৯.২৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২.৬ শতাংশ বেশি। আমদানি ও রপ্তানির এই অনুকূলমানের ব্যবধান থেকেই পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে দেশে ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ না আনলে এবং রপ্তানি বহুগুণ বাড়াতে না পারলে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়বে। তারা সতর্ক করেন স্বল্পমেয়াদি ভোগ্যপণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ভ্যালু-অ্যাডেড রপ্তানি বাড়ানো ও বহুমুখী বাজার নির্ভরতা বাড়ানো এই বিষয়গুলো জরুরি।

ব্যালেন্স অব পেমেন্টের অন্যান্য সূচকেও মিশ্র চিত্র দেখা যায়। চলতি হিসাবে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) সামান্য ঋণাত্মক অবস্থায় আছে; ফেব্রুয়ারির শেষে চলতি হিসাব ঘাটতি ছিল প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১৪৭ কোটি ডলারের তুলনায় কম। মোট সামগ্রিক লেনদেন (ওভারঅল ব্যালান্স) ভালো অবস্থায় রয়েছে; আলোচিত সময়ে ওভারঅল ব্যালান্স দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪৩ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছর একই সময়ে এটি ঋণাত্মক ছিল প্রায় ১১৫ কোটি ডলার।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে — এই অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ২ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার (প্রায় ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার) রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি।

প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কিছুটা কমেছে; গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালীন এফডিআই ছিল প্রায় ১০৬ কোটি ডলার, চলতি সময়ে প্রাপ্তি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ কোটি ডলারে। অপরদিকে শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ নিট হিসেবে ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে — এ খাতে(net) প্রায় ৮ কোটি ডলার বেরিয়ে গেছে, যা আগের বছরও প্রায় সমপরিমাণ ঋণাত্মক ছিল।

সংক্ষেপে, রপ্তানি বাড়লেও আমদানির তীব্রতা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মনেহয়, স্থায়ীভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমদানির দক্ষ নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার অন্বেষণ অপরিহার্য।