বুধবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পয়লা বৈশাখে শুরু ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ — কে পাবেন, কী সুবিধা?

বৃহস্পতিবার পয়লা বৈশাখে টাঙ্গাইল শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে ল্যাপটপের সুইচ চাপ দিয়ে দেশব্যাপী ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে তিনি সশরীরে উপস্থিত থেকে ডিজিটাল পোর্টালে যুক্ত হন এবং একই সময়ে ভিডিও কনফারেন্সে দেশের আটটি বিভাগ ও দশটি উপজেলার ১১টি ব্লকে প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু করা হয়। উদ্বোধনী অংশে জানিয়ানো হয়, প্রাথমিকভাবে ২০ হাজারেরও বেশি কৃষকের ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করে এই বহুমুখী কার্ড বিতরণ শুরু করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এই ডিজিটাল কার্ড কেবল পরিচয় নয়; এটি কৃষকের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রতীক। সরকারের লক্ষ্য—কৃষির অবদানের স্বীকৃতি ও কৃষকদের জন্য স্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।’

কাজটি তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে বলে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানান। প্রথম ধাপ হচ্ছে আজ থেকে শুরু হওয়া প্রাক-পাইলটিং, যার জন্য প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে আগস্ট পর্যন্ত দেশের ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম চালানো হবে। তৃতীয় ধাপে পাইলট অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে আগামী চার বছরের মধ্যে সারাদেশে তথ্যভাণ্ডার তৈরি ও কার্ড বিতরণ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রাক-পাইলটিংয়ে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে ফসল উৎপাদনকারী কৃষক, মৎস্যজীবী, প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি, দুগ্ধ খামারি এবং উপকূলীয় লবণচাষীসহ ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শ্রেণির কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সোনালী ব্যাংকের শাখায় সংশ্লিষ্টদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে এবং কার্ডটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড হিসেবে কাজ করবে। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৬৫ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ভূমিহীন ২,২৪৬, প্রান্তিক ৯,৪৫৮, ক্ষুদ্র ৮,৯৬৭, মাঝারি ১,৩০৩ এবং বড় কৃষক ৯১ জন। এর মধ্যে ২০,৬৭১ জন কৃষক বছরে সরাসরি আড়াই হাজার টাকা নগদ বা উপকরণ ভর্তুকি পাবেন।

কৃষক কার্ডে পাওয়া সুবিধা (সংক্ষেপে):

– ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ

– সেচে সাশ্রয়ী সুবিধা

– সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক ঋণসুবিধা

– সুলভ মূল্যে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি

– সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি কার্ডে প্রদান

– মোবাইলভিত্তিক আবহাওয়া ও বাজার তথ্য

– কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ

– পেস্ট ও রোগবালাই দমন সংক্রান্ত পরামর্শ

– কৃষি বিমা: প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির সময়ে আর্থিক সহায়তা

– ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুযোগ

প্রধান সুবিধাগুলোর মধ্যে মূলভাবে সরকারিভাবে ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের ব্যাংক/কার্ডে পাঠানো, শপিং পয়েন্টে POS মেশিন দিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে সার-বীজ কেনা, অগ্রাধিকারভিত্তিক কৃষি ঋণ ও দুর্গতিতে কৃষি বিমা রয়েছে। মোবাইলের মাধ্যমে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং বাজার দর জানার সুবিধাও থাকবে, যা উৎপাদন ও বিক্রয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

কীভাবে নিবন্ধন করবেন

সরকারি নির্দেশনায় স্মার্ট কৃষক কার্ড পেতে কৃষকদের নিম্নলিখিত কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে:

– জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) কপি

– পাসপোর্ট সাইজের ছবি

– রেজিস্ট্রেশনকৃত মোবাইল নম্বর

– জমির দলিল বা বর্গা/ভাগে চাষিদের জন্য প্রমাণপত্র

– ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট নম্বর

নিবন্ধন প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্তভাবে: স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (SAAO) প্রথমিক তালিকা তৈরি করবেন। এরপর উপজেলা কৃষি অফিস মাঠ পর্যায়ে তথ্য যাচাই-বাছাই করে ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করবে এবং যাচাই শেষে কার্ড বিতরণ করা হবে। অনেক ক্ষেত্রে তালিকা পূরণ অনলাইনেও সম্ভব হবে এবং কর্মকর্তারা কৃষকদের পরিচালনায় সহযোগিতা করবেন।

সতর্কবার্তা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।’ সরকার এমনকি জোর দেন যে কার্ডটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কৃষকদের অনুরোধ করা হয়েছে—কার্ড পাওয়ার জন্য কোনো আর্থিক লেনদেনে জড়াবেন না এবং প্রতারণার শিকার হবেন না।

সংক্ষেপে, সরকারের লক্ষ্য এই ‘কৃষক কার্ড’ উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষিকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত পটভূমি দেওয়া, যাতে সুবিধা সঠিকভাবে ও সরাসরি কৃষকের ঘরে পৌঁছায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে।