শুক্রবার, ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চোখের জলে বিদায়: পঞ্চভূতে বিলীন হলেন আশা ভোঁসলে

ভারতীয় উপমহাদেশের খ্যাতনামা শিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই। সোমবার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক শ্মশানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। শেষকৃত্যে মুখাগ্নি করেন তার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে। এ দিনটি সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য নিঃসন্দেহে এক শূন্যতার দিন।

গতকাল সকাল থেকেই মুম্বাইয়ের লোয়ার পারলের আশা ভোঁসলের বাড়ির সামনে মানুষের ঢল নামে। চাঁদের হাটের মত জমায়েতটা উৎসবমুখর ছিল না—সবার মন ছিল শোকাভিভূত। বোন লতা মঙ্গেশকরের কন্যা মীনা খাড়িকর সহ বিনোদন, ক্রীড়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পাশে ছিলেন অভিনেতা আমির খান, ক্রিকেট তারকা শচীন টেন্ডুলকার, সংগীত পরিচালক এ.আর. রহমান, গায়ক জাভেদ আলি, অভিনেত্রী টাবু, আশা পারেখ, নীল নীতি ন মুকেশ এবং জ্যাকি শ্রফসহ আরও অনেকে। রাজনৈতিক বিভিন্ন ধারার বরিষ্ঠ নেতারাও শ্রদ্ধা জানাতে ভীড় করেন।

বাসভবন থেকে মরদেহ শিবাজি পার্ক শ্মশানে নেওয়ার সময় শববাহী গাড়িটি সাদা-হলুদ ফুলে মোড়া ছিল। রাস্তার দুই পাশে ভক্ত-অনুরাগীরা দাঁড়িয়ে তাদের ভালোবাসার শেষ শ্রদ্ধা জানায়; চোখে অশ্রু, কণ্ঠে স্মৃতিচারণ। শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র, সংগীত, রাজনীতি ও ক্রীড়াজগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

আশা ভোঁসলে গত ১১ এপ্রিল অসুস্থ হয়ে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। রবিবার (১২ এপ্রিল) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

আশা ভোঁসলের সংগীতজীবন ছিল বিস্ময়কর এক অধ্যায়—১৯৪৩ সালে শুরু করা এই ক্যারিয়ার আট দশকেরও বেশি সময় ধরে ছড়িয়ে ছিল। তিনি শুধু হিন্দি গানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; ২০টিরও বেশি ভারতীয় ভাষা এবং কিছু বিদেশি ভাষায়ও তিনি গান রেকর্ড করেছেন। সিনেমার জন্য মোট ৯২৫টিরও বেশি ছবিতে গান গেয়েছেন এবং ধরনা করা হয় যে তাঁর গানের সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি। ২০০৮ সালে তাকে ভারত সরকার পদ্মভূষণ দিয়ে সম্মানিত করে এবং ২০১১ সালে গিনেস বুকে তিনি সর্বাধিক সংখ্যক গান রেকর্ডকারী হিসেবে নাম লেখান।

ব্যক্তিগত জীবনে আশা ভোঁসলের প্রথম স্বামী ছিলেন গণপতরাও ভোঁসলেহৃদয়, যিনি 당시 লতা মঙ্গেশকরের সেক্রেটারি ছিলেন; আশা তাঁর সাথে ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন, আর গণপতরাও তখন ছিলেন ৩১ বছর বয়সী। তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক ১৯৬০ সালে ভেঙে যায়। পরে ১৯৮০ সালে তিনি সংগীত পরিচালক আর.ডি. বর্মনের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন; ১৯৯৪ সালে আর.ডি. বর্মনের মৃত্যু ঘটে।

আশা ভোঁসলের বিদায় শুধু এক কণ্ঠের অবসান নয়—এটি ছিল সঙ্গীত জগতে এক যুগের সমাপ্তি। তার প্রশস্ত পরিসরের রেকর্ডিং, বহুমাত্রিক কণ্ঠ এবং নিরলস সৃজনশীলতা তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে ভোঁসলে নামধারী করে রেখে গেছে। সুরপ্রেমীরা হয়তো আজ ক্ষত অনুভব করলেও, তার গাওয়া লক্ষাধিক গান প্রতিদিনই তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে।