শুক্রবার, ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

রিপোর্টে অভিযোগ: গাজার বন্দিদের ওপর ইসরায়েলের ‘সুসংগঠিত’ যৌন নির্যাতন

একটি বিশদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা থেকে আটক করা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর ইসরায়েলের কারাগারে ধারাবাহিকভাবে ভয়াবহ যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানো হচ্ছে এবং এটি একটি ‘সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় নীতি’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এই দাবিটি ইউরো-মেডিটেরিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের সংগৃহীত সাবেক বন্দিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মিডল ইস্ট আই এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নির্যাতনের নেপথ্যে ইসরায়েলের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তারা এবং বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন বা নীরব সমর্থন রয়েছে—এমনটাই দাবি করেছে তদন্তকারীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে পরিকল্পিতভাবে বন্দিদের মর্যাদা ও শারীরিক-মানসিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।

সাক্ষীদের বর্ণনা অনুযায়ী নির্যাতনের ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক কুকুর ব্যবহার করে যৌন নিপীড়ন, বিভিন্ন কঠিন বস্তু দিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা এবং গোসলকক্ষে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় আটকে রাখা। রেকর্ড করা সাক্ষ্যগুলোতে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা নির্যাতনের সময় ভিডিও ধারণ করত এবং জিজ্ঞাসাবার সময়ে সেই ফুটেজ দেখিয়ে বন্দিদের ব্ল্যাকমেইল করত।

গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে আটক করা ৪২ বছর বয়সী এক নারী সাবেক বন্দি তার দুঃসহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেছেন, তাকে এসডি তেইমান নামে পরিচিত একটি কেন্দ্রের কক্ষে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ধাতব টেবিলে বেঁধে দুই দিন ধরে মুখোশধারী সৈন্যরা বারবার ধর্ষণ করেছে। তিনি জানিয়েছেন, ওই দুঃসহ সময় তিনি নিজের মৃত্যু কামনা করেছিলেন এবং ঘটনার তুলনা ‘‘আরেকটি গণহত্যা’’র সঙ্গে করেছেন।

আরেক সাবেক বন্দি, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আমির (৩৫), বলছেন সৈন্যদের নির্দেশে একটি প্রশিক্ষিত কুকুর তাকে যৌন নির্যাতন করেছে এবং একই সঙ্গে মারাত্মক শারীরিক আঘাতও করা হয়েছে—যা তিনি গভীরভাবে আপত্তিজনক ও লাঞ্ছনাকর মনে করেন।

ইউরো-মেড মনিটরের মাঠ গবেষক খালেদ আহমেদ অভিযোগ করেছেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতার একটি নির্দিষ্ট ধরন, যার লক্ষ্য বন্দিদের মানবিক মর্যাদা ও আত্মশক্তি ধ্বংস করা। একই সঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন হামলা শুধু ব্যক্তিকে নয়, তার পরিবার ও রক্ষণশীল সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদে ক্ষত সৃষ্টি করে।

বন্দিদের পক্ষ থেকে কাজ করা আইনজীবী খালেদ মাহাজনা একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেছেন, এসডি তেইমান কারাগারে এক বন্দির ওপর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের নোজল ব্যবহার করে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে, যার ফলে ভুক্তভোগীর শরীরে অভ্যন্তরীণ মারাত্মক ক্ষতসাধন ঘটেছে।

প্রতিবেদনটির আরও দাবি, ইসরায়েলি চিকিৎসক এবং বিচারিক সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধীদের রক্ষা করছে—চিকিৎসকরা নির্যাতনের শারীরিক চিহ্ন লুকিয়ে দিচ্ছেন এবং বিচার বিভাগ সন্দেহভাজন অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ করে দিচ্ছে। গত মার্চে এসডি তেইমান কারাগারে এক ফিলিস্তিনিকে গণধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত পাঁচ সেনার বিরুদ্ধে করা অভিযোগও পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হয়, যদিও ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে নির্যাতনের প্রমাণ ছিল বলে বলা হয়েছে।

ইউরো-মেড মনিটরের উপসংহারে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংসে নেতৃত্ব দিতে পারে—এমনকি আন্তর্জাতিক গণহত্যা বিরোধী সংবিধানের নিদর্শনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারে। এর আগেও জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতাকে ‘‘যুদ্ধের হাতিয়ার’’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ এনেছে।

তদন্তকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের নির্যাতন কেবল ব্যক্তিগত ট্রমার বিষয় নয়; তা পরিবার ও সমাজ স্তরে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি বয়ে আনবে। প্রতিবেদনের দাবি ও অভিযোগগুলো সম্পর্কে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া এখানে ব্যাখ্যাযোগ্য নয় বলে মিডল ইস্ট আই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।