রবিবার, ১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হল যখন বিজেপি প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করল এবং তার নেতাকর্মীরা শপথ নিলেন। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী, যা পশ্চিমবঙ্গের ৫৯ বছর পুরনো রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি মূলত ১৯৬৭ সালের সেই স্মরণীয় মুহূর্তের পুনরাবৃত্তি, যখন অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় তার পর দ্বিতীয় নেতা হিসেবে ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করে শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন।

শনিবার, কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এই অনুষ্ঠান ছিল রাজনীতিতে এক বিরল ঘটনা, যেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ—প্রধানমন্ত্রী মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপির শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি নিতিন গড়করী, রাজ্য ও কেন্দ্রের বিভিন্ন মন্ত্রীরাও।

শুভেন্দুর মন্ত্রীসভায় পাঁচজনের নাম ঘোষণা করা হয়, যাঁরা হলেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক ও ক্ষুদিরাম টুডু। এর পরে শপথ গ্রহণ করেন দিলীপ ঘোষ, তারপর অগ্নিমিত্রা, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক ও ক্ষুদিরাম। অনুষ্ঠানস্থলে রবীন্দ্র জয়ন্তীর দিনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী মোদি। পাশাপাশি দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়।

অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রথম উপস্থিত হন এবং বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ, অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু, মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফড়ণবীশ, আসামের হিমন্ত বিশ্বশর্মা, ত্রিপুরার মানিক সাহা, দিল্লির রেখা গুপ্ত, বিহারের সম্রাট চৌধুরী, উত্তরাখন্ডের পুষ্কর সিং ধামি সহ আরও কত লোক উপস্থিত ছিলেন। প্রচুর প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ মানুষ অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হলেও তিনি কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই আসন থেকে তিনবার ভোটে জিতেছিলেন। বিধায়ক হিসেবে তিনি ২০২১ সালে নন্দীগ্রাম থেকে এবং এ বছর ভবানীপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন। ফলে তিনি দুই কেন্দ্রে নির্বাচন জয় করে বিধানসভায় প্রবেশ করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান এবং তার কৌশলের মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে মেদিনীপুরের অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। উভয় নেতাই ক্ষমতার প্রথম দিকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে জনসংযোগে ছিল এবং সেচমন্ত্রী হিসেবে তাদের ক্যারিয়ার শুরু। অজয় বাবু ১৯৬৭ সালে খাদ্যসংকটের সময় জনরোষের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। অন্যদিকে, শুভেন্দু ২০২৬ সালে দুর্নীতির অভিযোগ ও পরিবর্তনের আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনীতিতে নামেন।

অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের কারণে শুক্রবার দলীয় বৈঠকে শুভেন্দুকে বিজেপির সর্বভারতীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এই বিজয় বিজেপিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে এককভাবে সরকার গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো ভীতির পরিবেশ কাটিয়ে একটি ভরসার স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা।

শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের এক বরেণ্য যুব নেতা, যিনি ২০২১ থেকে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে থেকে তিনি বিধানসভা ও লোকসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বাবার নাম শিশির অধিকারী, যিনি বহুবার প্রভাবশালী নেতা এবং কেন্দ্রের মন্ত্রী ছিলেন। নিজের রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছেন কংগ্রেসে, পরে তৃণমূল কংগ্রেসে ঢুকে নেতৃত্বের শীর্ষে উঠেছেন। ২০০৬ সালে তিনি কাঁথি দক্ষিণ থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালে লোকসভায় সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হন।

২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি তমলুক কেন্দ্রের সাংসদ ছিলেন, পরে ২০১৬ থেকে ২০২০ পর্যন্ত পরিবহনমন্ত্রী, আর ২০২০ থেকে ২০২১ পর্যন্ত পাট নিগমের চেয়ারম্যান। রাজনীতিতে তার উত্থান, কংগ্রেস থেকে তৃণমূল ও শেষপর্যন্ত বিজেপিতে যোগদান—সবই তাকে বাংলার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চিত্র করে তুলেছে। বর্তমানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের এক অন্যতম শক্তিশালী কৌশলী নেতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।