শনিবার, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বন্ধ ও আংশিক চালু কারখানা পুনরায় চালু করতে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা, সুদ মাত্র ৭%

বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ ও আংশিকভাবে চলছে এমন কারখানাগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় ফেরাতে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে। এই তহবিলের আওতায় বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি মূলধন হিসেবে ঋণ নিতে পারবে, গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার রাখা হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ—যা বর্তমানে বাজারে লাগা গড় সুদের প্রায় অর্ধেক।

বাংলাদেশ ব্যাংক আজ বৃহস্পতিবার রাতে ‘‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত–সহায়ক প্রাক্‌-অর্থায়ন স্কিম’’ নীতিমালা জারির মাধ্যমে ওই তহবিলের কার্যপ্রণালী ঘোষণা করেছে। এটি গত ২৩ মে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের ধারাবাহিক উদ্যোগ।

নীতিমালার মূল সুরঃ একটি কোম্পানি বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত চলতি মূলধন ঋণ নিতে পারবে। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ওই তহবিলের টাকা ৪ শতাংশ সুদে নেবে, আর গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ ধার্য হবে। ঋণগ্রহীতাদের জন্য ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড থাকবে, অর্থাৎ প্রথম ছয় মাস সুদের কিস্তি শুরুর আগে।

কারা আবেদন করতে পারবে:

নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিগতভাবে চালু হওয়ার উপযোগী—যেখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু চলতি মূলধনের অভাবে উৎপাদন বা সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না—তারা এই তহবিল থেকে ঋণ পাবে। জাতীয় শিল্পনীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘‘বৃহৎ’’ খাতের আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। রপ্তানিমুখী এবং প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানদেরও বিশেষ সুবিধা প্রদানের কথা রয়েছে। এছাড়া, কোনো দক্ষ প্রতিষ্ঠান যদি বন্ধ থাকা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ বা ইজারা নিয়ে তার কার্যক্রম সচল করে, তাহলে তাদেরও অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

শর্তাবলি ও নিষেধাজ্ঞা:

ঋণপ্রার্থীকে ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) রেকর্ডে কাঙ্খিতভাবে খেলাপি হতে পারবে না এবং পূর্বে অর্থ পাচার বা ঋণের অপব্যবহারের কোনো রেকর্ড থাকলে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। ব্যাংকগুলো প্রয়োজনে ঋণপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলিতে ব্যাংকের প্রতিনিধি বসাতে পারবে।

ঋণের ব্যবহার:

এই ঋণ শ্রমিক-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন ও ভাতা পরিশোধ, বিদ্যুৎ–গ্যাস ও অন্যান্য পরিষেবা বিল পরিশোধ এবং উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহে ব্যবহৃত হবে। শ্রমিকদের বেতন অবশ্যই তাদের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে প্রদান করতে হবে; কোনোভাবেই নগদ লেনদেন করে বেতন দেয়া যাবে না। এছাড়া, এই তহবিল থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে পূর্বের কোনো ঋণের দায় পরিশোধ বা সমন্বয় করা যাবে না।

তদারকি ও আদায় ব্যবস্থা:

ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকদের থেকে সাপ্তাহিক বিক্রয় বা রাজস্ব রিপোর্ট তুলতে হবে। ব্যাংকের প্রতিনিধিরা প্রতি তিন মাস অন্তর কারখানা পরিদর্শন করে প্রতিবেদনে বিষয়গুলো তুলে ধরবেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো সময় সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা কেটে নেবে এবং অতিরিক্ত ২ শতাংশ দণ্ড সুদ আরোপ করা হবে।

নীতিমালার উদ্দেশ্য:

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি আনা, উৎপাদন বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সফলভাবে তহবিল ব্যবহারে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা প্রতিষ্ঠান ও অংশগ্রহণী ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বা সম্মাননা প্রদানের কথাও নীতিমালায় রাখা হয়েছে।

সংক্ষেপে, এই প্রাক্‌-অর্থায়ন স্কিমের মাধ্যমে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ধ বা আংশিকভাবে বন্ধ থাকা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরিয়ে এনে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে চায়—আর তা করতে কোম্পানিগুলোকে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী সুদে চলতি মূলধন ঋণ দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।