বুধবার, ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জামায়াত পেশ করলো ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ‘ছায়া বাজেট’

বস্তুনিষ্ঠ ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রগঠনের দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ প্রস্তাব করেছে। দলটি বলেছে, এটি গত দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ক্ষত সারিয়ে সামাজিক ন্যায়, সাম্য ও মানবিক মর্যাদায় অভিসিক্ত আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য বহন করে।

মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই ছায়া বাজেটটি তুলে ধরেন ঢাকা-১২ আসনের সাংসদ ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বাজেটের আকার, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও প্রধান নীতিসমূহ উপস্থাপন করেন।

প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা এবং সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ।

জামায়াত বলেন, তাদের বিকল্প বাজেটের মূল উদ্দেশ্য প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয়—বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। এছাড়া অর্থনীতি সুস্থ করতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অদক্ষতা দূর করে স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টন জরুরি মনোভাব তাদের বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।

বাজেট উপস্থাপনায় মিলন সরাসরি বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলের সমালোচনা করে বলেন, ঐ সময় ব্যাংকব্যবস্থা শক্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে এবং ২০০৯-২০২৩ সময়কালে ২৮ লাখ কোটি টাকা দেশে থেকে পাচার হয়েছে। তিনি বলেন, ওই অর্থ ফিরে আনা হলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ব্যাপক বাড়তি বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়ে জামায়াত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা যারা বর্তমানে ৬৫০-৯০০ টাকার মধ্যে আছে, সেগুলোকে প্রথমে ১ হাজার টাকা এবং ধীরে ধীরে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব এসেছে।

ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মসজিদকর্মীদের জন্যও ভাতা বাড়ানোর সূচী দেওয়া হয়েছে—প্রস্তাব অনুযায়ী দেশের সব মসজিদের ইমামদের মাসিক ৭,৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫,০০০ টাকা এবং খাদেমদের ৩,০০০ টাকা করে সম্মানী দেওয়ার আহ্বান করা হয়েছে।

ট্যাক্স নীতি ও করছাড় নিয়ে জামায়াত জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)কে ব্যবসায়িক/ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব করেছে, যাতে আলাদা টিন নম্বরের প্রয়োজন না থাকে এবং করজাল সম্প্রসারণ দ্রুত করা যায়। ব্যক্তিগত আয়করমুক্ত সীমা ৪.৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাগত খরচ হিসেবে প্রতি সন্তানের জন্য বছরে ৫০ হাজার টাকা এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাথাপিছু আরও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কররেয়াত দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রাসা সরকারিকরণের প্রস্তাবও করা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন সেবা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, গর্ভধারণের শুরু থেকে সন্তানের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত সকল মায়ের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।

সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করেন মিলন—প্রস্তাবে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য নতুন স্কেলের ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ রয়েছে।

অবশেষে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের আগে জনগণের সামনে তাদের কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ভাবনা তুলে ধরতেই এই বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। দলটি জনগণের জীবনমান ও মৌলিক সেবা জোরদার করার ওপর জোর দিয়ে উল্লেখ করেছে যে, প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন অর্থনীতি স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও ন্যায়ভিত্তিক হবে।