ভেনেজুয়েলায় গত বুধবারের ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের চার দিনে রাজধানী কারাকাস, লা গ্যুইরা ও অন্যান্য শহরের ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১,৫০০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ছয়শত নয়—না, ভুল হলো; তথ্য অনুযায়ী আহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১৫০। পাশাপাশি প্রায় ১২ হাজার ৭২১ জনকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের তলায় এখনও বহু মানুষ আটকে থাকতে পারে বলে ধারণা করে দেশি-বিদেশি উদ্ধারকর্মীরা দিনরাত উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। সরকারিভাবে নিখোঁজের সংখ্যা কয়েকশ’ বলা হলেও বিরোধী পক্ষের সমর্থিত এক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে এখনও নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আগে সেই তালিকায় সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৫ হাজার।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে আমাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত আছে। ‘‘ধ্বংসস্তূপের তলায় আমাদের স্বজনরা জীবিত আছেন—এই থেমে থাকা আশা নিয়েই আমাদের কাজ চলছে,’’ তিনি বলেছেন। তিনি আরো জানান, উদ্ধারকাজ শেষ করতে এখনো সময় লাগবে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতে ২৪ জুন স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে প্রথমে মাত্রা ৭.২ এবং ৪০ সেকেন্ডের মধ্যেই পরে ৭.৫ মাত্রার এক শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পটি ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী ও প্রাণহানিকর হতে পারে।
দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার জর্জ রদ্রিগুয়েজ জানান, এখন পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে ১,৪৫০ মরদেহ এবং আহত অবস্থায় ৩ হাজার ১৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভূমিকম্পে কমপক্ষে ৭৭৪টি ভবন ধসে পড়েছে। ইউএসজিএস সতর্ক করে দিয়েছে যে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
প্রথম কয়েকদিন স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকরা সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়েছিলেন। পরে যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, কাতারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২,৬০০ জন বিশেষায়িত উদ্ধারকর্মী এসে তল্লাশি ও উদ্ধার কার্যক্রমে যোগ দিয়েছেন। সুইস উদ্ধারকারী দলের প্রধান সেবাস্টিয়ান ইউগস্টার বলেন, ‘‘প্রথম ৭২ ঘণ্টা জীবিত উদ্ধার করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের পর জীবিত উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা দ্রুত কমে যায়।’’
অনেক অনুসন্ধানী কুকুর ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষের অবস্থান শনাক্ত করলেও সময়মতো সবার উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবু কিছু অলৌকিক উদ্ধারকাণ্ডও ঘটেছে—যুক্তরাষ্ট্রের একটি দল ধ্বংসস্তূপ থেকে এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করে এবং কলম্বিয়ার একটি দল ধ্বংসস্তূপের প্রায় তিন মিটার নিচ থেকে ১১ বছর বয়সী মোইসেস নামের একটি ছেলে উদ্ধার করেছে; তাঁর একটি হাত ভেঙে গেছে, কিন্তু মা ও বোন নিহত হয়েছেন। মেক্সিকোর উদ্ধারকারী দলও কারাবালেদার একটি ধসে পড়া ভবন থেকে আরেক ১১ বছর বয়সী শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছে।
ভূমিকম্পের ফলে ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। দেলসি রদ্রিগুয়েজ বলেছেন, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করছেন এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যে দেশের অন্তত ৭৫ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার লক্ষ্য রয়েছে। তবু তৎকালীন পরিস্থিতি তোড়জোড় ও পুনর্বাসনকে ব্যাহত করছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতেও—রোববার Amuay তেল শোধনাগারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে জ্বালানি সরবরাহে ও অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত আছে। পোপ লিও ভেনেজুয়েলাবাসীর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে নিহতদের জন্য প্রার্থনা করেছেন এবং উদ্ধারকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসন আগে ঘোষিত ১৫ কোটি ডলারের সহায়তার পাশাপাশি আরও কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলারের একটি নতুন সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে।
এ ভয়াবহ দুর্যোগে বহু পরিবার এখনও স্বজন-সম্পর্কে বিভ্রান্ত; অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে তাদের প্রিয়জন খুঁজছেন। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, আশা ও দ্রুত সেবার সমন্বয়ই এখন সবচেয়ে জরুরি—চোখে আঁচড়া লাগা দুঃখ আর ধ্বংসের মাঝে দ্রুত পুনরুদ্ধার ও মানবিক সহায়তা দিতে হবে।
সূত্র: রয়টার্স





