ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভের ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে পাঞ্জাবের বিতর্কিত চলচ্চিত্র ‘সতলুজ’ হঠাৎ করে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ও আলোচনা ছড়িয়েছে। ছবিটি মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারতের দর্শকদের জন্য স্ট্রিমিং বন্ধ করে দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রটি শিখ মানবাধিকারকর্মী জশবন্ত সিং খালরার জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত; প্রধান ভূমিকায় আছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক দিলজিৎ দোসাঞ্জ।
ছবিটি অপ্রত্যাশিতভাবে প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে দিলজিৎ দোসাঞ্জ সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না।” একটি ভিডিওক্লিপ শেয়ার করে তিনি পাঞ্জাবিতে লিখেছেন, ‘হুন নি রুকনি ফিল্ম। খালরা সাব দি আওয়াজ নু কোই নি দাবা সাকদা।’
জি-ফাইভের অফিসিয়াল বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মুক্তির পর থেকে ‘সতলুজ’‑কে দর্শকদের পাওয়া সাড়া তাদের অভিভূত করেছে এবং তারা ছবির সৃজনশীল কাজের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির কারণে, পরবর্তী কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভারতের ক্যাটালগে ছবিটির স্ট্রিমিং বন্ধ থাকবে। জি-ফাইভ জানায় তারা আইনি পথে ছবিটি দ্রুত ভারতীয় দর্শকদের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। বিদেশে ‘জি-ফাইভ গ্লোবাল’ প্ল্যাটফর্মে ছবিটি এখনও দেখা যাচ্ছে।
ছবির বিষয়বস্তু ও ইতিহাস
হানি ত্রেহান পরিচালিত ও দিলজিৎ দোসাঞ্জ ও অর্জুন রামপাল অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি মূলত ১৯৮৪‑১৯৯৪ সালের মধ্যে পাঞ্জাবে পুলিশি নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী শনাক্তকরণ ও সৎকারের লড়াইকে তুলে ধরে। জশবন্ত সিং খালরা ছিলেন সেই সময়কালের একজন সাহসী অধিকারকর্মী; তিনি প্রমাণ করেন যে প্রায় ২৫ হাজার অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল এবং অনেক পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজশ ছিল। ১৯৯৫ সালে খালরাকে অপহরণ ও পুলিশের হেফাজতে হত্যা করা হয়; সিবিআই তদন্তের পর ২০০৭ সালে পাঞ্জাব‑হরিয়ানা হাইকোর্ট ওই হত্যাকাণ্ডে চার পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ছবিটি কেন সরিয়ে দেওয়া হল—এ নিয়ে পাঞ্জাবের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শিরোমনি আকালি দলের সভাপতি সুখবীর সিং বাদল বলেন, এটি আমাদের যৌথ স্মৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। কংগ্রেস নেতা সুখপাল সিং খাইরা চলচ্চিত্রটি দ্রুত প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনার দাবি করেন ও বলেন, ছবিতে দেখানো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আদালতের রায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আম আদমি পার্টির সংসদ সদস্য মালবিন্দর সিং কাং কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ছবিটি ব্লক করে তারা পাঞ্জাবের সত্য লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে। শিরোমনি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটির প্রধান সচিব কুলবন্ত সিং মানান বলেন, মানুষকে ইতিহাস দেখে নিজস্ব মত তৈরি করার অধিকার রয়েছে।
সেন্সরশিপ ও মুক্তির জটিলতা
চলচ্চিত্রটি দীর্ঘদিন ধরে সেন্সর সংক্রান্ত জটিলতায় আটকে ছিল। ২০২২ সালে ‘ঘাল্লুঘারা’ শিরোনামে সিবিএফসিতে জমা দেওয়ার সময় বোর্ড ১২৭টি দৃশ্য কেটে ফেলতে বলেছিল এবং নাম পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিল—তারপর প্রযোজকরা বম্বে হাইকোর্টে আপিল করেন, পরে সেই আপিল প্রত্যাহার করেন। চলচ্চিত্রটি ২০২৩ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ছাড়াও গত ৩ জুলাই ‘সতলুজ’ নামে জি-ফাইভে মুক্তি পায়। পরিচালক হানি ত্রেহান বলেন, থিয়েটার রিলিজ না পাওয়ার পর গোপনীয়তার সঙ্গে ওটিটি মুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল; প্রযোজকরা সেন্সর সার্টিফিকেট ছাড়া সরাসরি ওটিটিতে যেতেই বাধ্য হন। দিলজিৎ দোসাঞ্জও দাবি করেছেন যে ওটিটি‑তে ছবিটি কোনো কাটছাঁট ছাড়াই স্ট্রিম করা হয়েছিল।
সমালোচনার কণ্ঠস্বর
চলচ্চিত্রটি ভারতীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় চলচ্চিত্র, সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার পর্যায়ে ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও পক্ষপাতমূলক সেন্সরশিপের অভিযোগ নতুন করে জেগে উঠেছে। অনেক সমালোচক প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত বা উগ্র দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থনকারী কিছু চলচ্চিত্র (যেমন ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’, ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ এবং পরে ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’) স্বতন্ত্রভাবে মুক্তি পায় ও সহজে প্রদর্শিত হয়, সেখানে কেন পাঞ্জাবের ইতিহাসভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক একটি চলচ্চিত্র ভারতীয় দর্শকদের কাছে থেকে সরিয়ে রাখা হল।
বর্তমান পরিস্থিতি অনিশ্চিতই রয়ে গেল—ছবিটি আন্তর্জাতিকভাবে দেখা গেলেও ভারতীয় দর্শকদের কাছে স্বাভাবিকভাবে ফিরবে কি না তা আইনি ও রাজনৈতিক হালচালের ওপর নির্ভর করবে।





