বৃহস্পতিবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: ইতিহাস, আবেগ আর কেবল ফুটবলের লড়াই

মেক্সিকো ১৯৮৬, ফ্রান্স ১৯৯৮, জাপান ২০০২—আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া শুধুই মাঠের লড়াই নয়। দু’দেশের সম্পর্ক ইতিহাস, রাজনৈতিক স্মৃতি ও গভীর আবেগে বেঁধে আছে। তবু আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের এই দ্বৈরথে আলাপ-আলোচনার কেন্দ্র হওয়া উচিত কেবল ফুটবল—ফকল্যান্ডস/মালভিনাস যুদ্ধ নয়।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা জেতার লক্ষ্যে আজ (বুধবার) রাতের ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে যেতে চাইছে আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালের আগে স্কালোনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘না, না, না। এটা শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ। অন্য কোনো বিষয় টেনে আনার দরকার নেই। এটি একটি দুর্দান্ত দলের বিপক্ষে ম্যাচ, যাদের কোচকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি একটি ফুটবল ম্যাচ, তার বেশি কিছু নয়।’

মধ্যমাঠের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় রদ্রিগো দি পলও একই সুরেই বলেছেন, তারা ঘটনাবাহিত ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করে—বিশেষ করে দিয়েগো ম্যারাডোনার কাজগুলোকে স্মরণ করে—কিন্তু মাঠে তাদের লক্ষ্য একটাই: জয় করে ফাইনালে ওঠা। তিনি স্মরণ করিয়েছেন যে মালভিনাসের জন্য গাওয়া গানগুলো মূলত স্মৃতিসৌধ; যেটা ঘটেছে তা ভয়াবহ ছিল এবং নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো উচিত, তবে ফুটবল কোর্টে ফোকাস থাকতে হবে।

ফকল্যান্ড/মালভিনাস যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত চিত্র

১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সংঘটিত হয় ফকল্যান্ড যুদ্ধ। দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনার সদস্যশাসক গঠনের তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রেক্ষিতে ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনা দ্বীপে অভিযান চালায়; জবাবে বৃটান প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দ্বীপ পুনরুদ্ধারের জন্য নৌবাহিনী পাঠান। যুদ্ধ ৭৪ দিন পর্যন্ত চলার পর ব্রিটিশ জয় নিশ্চিত হয়। আনুমানিক ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনার প্রাণহানি ঘটে।

পরবর্তীতে ২০১৩ সালে সেখানে বসবাসকারীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৯৯.৮ শতাংশ মানুষ ব্রিটিশ অধিকারেই থাকার পক্ষে ভোট দেন, যদিও সেটাও নানা বিতর্কের মধ্যে আছে। ভূগোলগতভাবে ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে, আর ব্রিটেন থেকে হাজার হাজার মাইল—এই দূরত্ব ও কলোনিয়াল ইতিহাসই দ্বীপের মালিকানা বিতর্কের জটিলতা বাড়িয়েছে। আর্জেন্টিনা স্থানীয় নাম মালভিনাস ব্যবহার করে দ্বীপটিকে নিজ ভূখণ্ড দাবি করে; অন্যদিকে ব্রিটেন সঙ্ঘবদ্ধভাবে সেখানে ১৮৩৩ সাল থেকে শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং বহু বাসিন্দাই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত।

খেলার মাঠে তাদের বিতর্কিত অধ্যায়

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ ফুটবলের ইতিহাসে নানা স্মরণীয় ও বিতর্কিত মুহূর্ত আছে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ওয়েম্বলিতে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাটটিনকে পোস্ট-ম্যাচ ঘটনায় মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয়—ঘটনাটি এমন বিতর্ক ডেকে আনে যে পরবর্তীতে ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি জোরালো হয়।

১৯৭৭ সালে বুয়েনস আয়ার্সের লা বোম্বোনেরায় একটি প্রীতি ম্যাচে ট্যাকলের জেরে সংঘটিত হাতে-কলমে মারামারিতে ইংলিশ খেলোয়াড় ট্রেভর চেরি ও আর্জেন্টাইন ড্যানিয়েল বার্তোনি একে অপরকে লাথি-ঘুষি করেন; ঘটনায় চেরির দাঁত ভেঙে যায় এবং উভয় খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

কিন্তু বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়ের একটি ঘটনা ঘটেছিল ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে, যখন দিয়েগো ম্যারাডোনা ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনের উপর একটি জোরালো হাত ব্যবহার করে গোল করেন—একে পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ বলা হয়। মুহূর্তের পরে তিনি বল টেনে নিয়ে চার জন ইংরেজ খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলে দৌড়ে গিয়ে শতাব্দীর এক উজ্জ্বল গোল করে দেখিয়েছিলেন। ওই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয় লাভ করে এবং বহু মানুষ সেই গোলকে প্রতিশোধ ও ফুটবলের ইতিহাসের মিশ্র অনুভূতির প্রতীক হিসেবে দেখেন। ম্যারাডোনা পরে বিভিন্ন সময়ে এই গোলকে ব্যাখ্যা করেছেন; এক পর্যায়ে বলেছিলেন, ‘হয়তো এটা ঈশ্বরের হাত ছিল’, আবার কোথাও তিনি যুদ্ধটিকে ‘দুই খুনি সরকারের সাজানো অর্থহীন লড়াই’ বলে বর্ণনা করেছেন—এবং ঘটনার নানান দিক নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে বিশ্লেষণও রেখেছেন।

১৯৯৮ বিশ্বকাপেও এই দ্বৈরথে নাটকীয়তা ছাড়া যায়নি—ম্যাচ শেষে স্কোর আবর্তিত হয়েছিল এবং ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড তো সেই ম্যাচকে অতিরিক্ত তীব্র করে তোলে; শেষ পর্যন্ত কড়া লড়াইয়ের পরে পেনাল্টি বাঁচাতে আর্জেন্টিনাই এগিয়ে যায়। ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত একটি প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে জয়ী হয়—তার পর থেকে দু’দলের সরাসরি মুকাবিলা ছিল সীমিত।

এখনও মাঠে ফুটবলই প্রধান

দীর্ঘ ঐতিহ্য, রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও ব্যক্তিগত আঘাত—এসব কিছুই এই লড়াইকে অতিরিক্ত আবেগঘন করে তোলে। তবু স্কালোনি, দে পলসহ অনেক আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় বারবার বলেছেন, মাঠে এখন তাদের কর্তব্য কেবল ফুটবলের মান উন্নত করা ও দলের জন্য সেরাটা দেওয়া। ইতিহাস ও স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে, মাঠে দুই দলের লড়াই আসলে খাঁটি ফুটবলই—যেখানে ক্রীড়া, দায়বদ্ধতা ও সম্মানই শেষ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করবে।