মঙ্গলবার, ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

২০২৪ সালে লোকসানে ১৭ ব্যাংক, সিএসআর ব্যয় অর্ধেকে নেমে এসেছে

২০২৪ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি সংগ্রামপূর্ণ বছর ছিল। অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণে একাধিক ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। যেখানে কিছু ব্যাংক ভালো মুনাফা করলেও, বেশিরভাগ ব্যাংকের আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। এর ফলস্বরূপ, কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয় ব্যাপক হারে কমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই বছর সিএসআর ব্যয়ে লক্ষ্য করা গেছে নাটকীয় পতন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) দেশের ৬১টি ব্যাংক মাত্র ৩৫২ কোটি ৯ লাখ টাকা সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪২ শতাংশ কম। এটি গত দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়, এর আগে ২০১৫ সালে সর্বনিম্ন ব্যয় ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ফলে, দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর এই খাতে ব্যয় ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০২৪ সালে সিএসআর ব্যয়ে ছিল মোট ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩০৮ কোটি টাকা বা ৩৩ শতাংশ কম। ২০২৩ সালে ব্যাংকগুলো ব্যয় করেছিল মোট ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, আর ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা। পরবর্তী দু বছরে মোট সিএসআর ব্যয় কমেছে বেশি than ৫০ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ে এই কমতির অন্যতম কারণ হলো, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন ও সরকারের পরিবর্তনের প্রভাব। জুন-জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের কারণে ব্যাংকিং খাতে বেশ বড় ধরনের চাপ পড়ে। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনিয়ম, লুটপাট এবং অর্থ পাচারের ঘটনা প্রকাশ পেতে শুরু করে, যা প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি উন্মোচনে সহায়তা করে। এর ফলে, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত লোকসান ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে, বেশ কটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। এসব ব্যাংকে কিছু শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর জের ধরে সরকার বিভিন্ন ব্যাংক একীভূত করার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নিয়ে থাকে।

ব্যাংকারদের অভিমত, রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও সিএসআর ব্যয় কমার প্রত interconnected এর পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো, আগে রাজনৈতিক চাপের কারণে ব্যাংকগুলো অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বা অনুৎপাদনশীল খাতে অর্থ ব্যয় করতো। তবে ২০২৪ সালে, আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের পর এই চাপ অনেকটাই কমে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলো অধিকতর বিবেচনা করে সিএসআর ব্যয় পরিচালনা করছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপের কারণে এই অর্থ সামাজিক দায়িত্বের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়, যা সমাজের উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার নির্দিষ্ট একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ শিক্ষা, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য এবং ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে।

তবে, বাস্তবে দেখা গেছে, এই নির্দেশনা কঠোরভাবে মানা হচ্ছে না। ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ৩৬ শতাংশ ব্যয় করেছে ‘অন্যান্য’ খাতে। শিক্ষায় ব্যয় ছিল প্রায় ২৮.৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় হলেও পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে ব্যয় মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

এছাড়া, এই বছর লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

বিশেষ করে জানানো হয়েছে, ছয়টি ব্যাংক এমন রয়েছেন, যারা মুনাফা অর্জন না করেও তাদের সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।