মঙ্গলবার, ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হরমুজে নিয়ন্ত্রণ পালে ইরানের ভাগ্য বদলে যেতে পারে, মাসে আয় হতে পারে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার

ইরান তেহরানকে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি চাওয়ার নীতিতে অনড় রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে—এমন খবর গত সোমবার ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট: ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতকে সাময়িকভাবে নয়, স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া বিরোধিতার মুখে টিকেই আছে; ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যালে করা বিতর্কিত মন্তব্যও এ প্রেক্ষিতেই এসেছে।

ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি খোলার দাবি জানালে প্রথমে বলপ্রয়োগের হুমকি দিলেও কূটনৈতিক বিকল্পও খোলা রেখেছিল। তবে ইরানের স্বার্থ ও নিরাপত্তার দিক থেকে এই নৌপথ নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত তারা জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে। হরমুজ সঙ্কটের গুরুত্ব অর্থনৈতিক: এই প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয় এবং বর্তমানে বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে রয়েছে।

তেহরান মার্কিন ১৫ দফার বদলে নিজস্ব ১০ দফার প্রস্তাব দিয়েছে। তাতে উল্লেখযোগ্য দাবি হলো—হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের অধিকারকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালানোর অধিকার মেনে নেওয়া, সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণের দাবিসহ অনান্য বিষয়। সবচেয়ে মূল দাবি হচ্ছে—হরমুজ প্রণালির ওপর স্বীকৃত নিয়ন্ত্রণ।

অর্থনৈতিক দিক থেকে হরমুজ এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘চোক পয়েন্ট’। প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার এবং ভূগোলগত নিয়ন্ত্রণ দুই দেশের—ইরান ও ওমানের হাতে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান বেশ কয়েকবার জাহাজ-ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত করে এবং চলাচল সীমিত করে দেয়, ফলে বিমা ও পরিবহন খরচ বাড়ে এবং জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে যায়।

পরে গোপন আলোচনার মাধ্যমে সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়; এর বিনিময়ে ইরান ‘টোল’ ধার্য করেছে—প্রতি জাহাজে প্রায় ১–২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (কিছু কনজারভেটিভ হিসাব ১০–১৫ লাখ ডলার ধরে থাকে), যেগুলোর বেশিরভাগই চীনা ইউয়ানে পরিশোধ করা হয়েছে। এমন নিয়ম চালু হলে ইরানের জন্য রাজস্ব ও স্বার্থ দ্বিগুণ হবে: কনজারভেটিভ হিসাব ধরলে শুধু অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর উপর হারে মাসিক প্রবাহ থেকে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার) আয় হতে পারে। গ্যাসবাহী জাহাজে একইভাবে টোল আরোপ করলে তা থেকে আরও প্রায় ৮০ কোটি ডলার মাসিক আয় আসতে পারে।

এই পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলেছে। অবরোধ ও তেল-অবকাঠামোর ওপর হামলার খবরের প্রেক্ষিতে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১১০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে—২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রায় ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি দেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গড় জ্বালানি মূল্য গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপ বাড়িয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—যুদ্ধ শেষ হলে সরবরাহ পুনরায় স্থিতিশীল হতে সময় লাগবে এবং দাম ধীরে নামার সুযোগ আছে। কিন্তু যদি শান্তি-চুক্তির শর্তে হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে ‘টোল’ কস্ট আমদানিতে যোগ হবে এবং পরিবহন ও বিমা ব্যয় বাড়বে—ফলশ্রুতিতে জ্বালানির দাম পুনরায় বাড়তে পারে। কতটা বাড়বে তা অনিশ্চিত; বিশেষ করে যদি বড় আমদানিকারক দেশগুলো (যেমন ভারত) বিশেষ ছাড় বা বিকল্প পথ খোঁজে।

আর্থিক সংস্থাগুলোর অনুমান ভিন্ন: গোল্ডম্যান স্যাচস বলেছে, সরবরাহ ব্যাহত হলে প্রতি ব্যারেলে ৪–১৫ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রিমিয়াম যুক্ত হতে পারে; অক্সফোর্ড ইকোনমিকস এই ঝুঁকি প্রিমিয়ামকে ২৫ ডলার পর্যন্ত সম্ভাব্য মনে করেছে।

দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ থেকে অর্জিত টোল আয়কে টেকসই বলে দেখা সহজ নয়—এমন রাজস্ব এশিয়ার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং তাতে প্রাপ্ত অর্থ পুনরায় ইরানকে সামরিক শক্তি পুনর্গঠনে ব্যবহার করার আশঙ্কাও আছে। তেহরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তহবিল যুদ্ধকালে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংগ্রহ বাড়াতে ব্যবহার করা হতে পারে।

বর্তমানে তেহরান নির্দিষ্ট কিছু দেশের (যেমন ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান) জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়ে রেখেছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ। যদি শান্তির পরও এই ধরণের নিষেধাজ্ঞা থাকে, তা নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করবে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে ‘নিয়ন্ত্রিত করিডর’ হিসেবে হরমুজ ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান এই ঝুঁকি কিছুটা কমাতে ও সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিহত করতে পারবে।

সমাপ্তিতে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব তাকে উপসাগরীয় জ্বালানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের একটি প্রহরী বা গেটকিপার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে—যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে তেহরানের نفوذ বাড়াবে এবং ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। এই সম্ভাব্য ফলাফলকে নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ও বিশ্লেষকরা সতর্কতা জাহির করেছেন—যদি যুদ্ধ এইভাবে শেষ হয়, তবে বিশ্ববাজার ও অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘ সময়ের প্রভাব পড়বে।

সূত্র: এনডিটিভি