শনিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটে অর্থনীতি ধ্বংসের পথে: অর্থমন্ত্রীর সতর্কবার্তা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, গত ১৬ বছরে বিরামহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের ফলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পৌঁছেছে এবং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তিনি এটি উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন যে এসব সমস্যা সমাধান না হলে সামনের দিনের উন্নয়ন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

এ কথা তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে (শুক্রবার) সকালে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন। ১৩তম দিনে সংসদের উপস্থিত ছিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান প্রশাসন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ফলাফল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং তারা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে। এ প্রেক্ষাপটেই তিনি ২০০৫-০৬ অর্থবছর, ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো তুলে ধরে দেশবাসীর সামনে একটি তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করেছেন।

তথ্যগুলোতে দেখা যায়, যদিও মোট জিডিপির আকার বাড়ছে, ততটাই প্রকট হচ্ছে গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.১৭ শতাংশ; কিন্তু ২০২৩-২৪ শেষে প্রবৃদ্ধি কমে ৪.২২ শতাংশে নেমে এসেছে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশ হয়েছে। শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ১০.৬৬ শতাংশ থেকে কমে ৩.৫১ শতাংশে নেমেছে এবং কৃষিক্ষেত্রের প্রবৃদ্ধিও ৫.৭৭ শতাংশ থেকে ৩.৩০ শতাংশে নামিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলছেন, শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতে ফিরে যাচ্ছেন—যার ফল হিসেবে ছদ্ম বেকারত্ব বাড়ছে এবং যুবজনের আয় ও উৎপাদনশীলতা বাড়ার সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে কৃষি শেয়ার মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ হলেও জাতীয় আয়তে তার অংশ মাত্র ১১.৬ শতাংশ, যা শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতা ও কর্মসৃজনবিহীন বৃদ্ধির সতর্ক সংকেত।

সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অনুপাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—২০০৫-০৬ সালে জাতীয় সঞ্চয় ছিল ২৯.৯৪ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে ২৮.৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। মুদ্রাস্ফীতির পাশাপাশি টাকার অভ্যন্তরীণ মানও উল্লেখযোগ্যভাবে ঘাটতি দেখা দিয়েছে; ২০০৫-০৬ সালে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল প্রায় ৬৭.২ টাকা, যা ২০২৪-২৫ সালে প্রায় ১২১ টাকায় দাঁড়িয়েছে—ফলশ্রুতিতে আমদানি ও সাধারণ জীবনের ব্যয় বাড়েছে।

অর্থ মন্ত্রীর ভাষ্য, মুদ্রা সরবরাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রবৃদ্ধিও চিন্তার বিষয়। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৮.৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ সালে মাত্র ৬.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও বিনিয়োগের মন্থরতার প্রকাশ। রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়েনি; রাজস্ব ফাঁকি ও অপচয় সরকারের আয় সংগ্রহের ক্ষমতা সীমিত করে রেখেছে। বাজেট ঘাটতি বেড়ে ২০০৫-০৬ সালের ২.৯ শতাংশ থেকে ৪.০৫ শতাংশে উঠেছে।

অতিরিক্তভাবে, অর্থমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন বিগত সরকারের সময় বাস্তবায়িত অনেক মেগা প্রকল্প অতিমূল্যায়িত এবং যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই এগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে; ফলে নৈতিক খাত থেকে লক্ষ কোটি টাকা অবৈধভাবে বহির্গমন হয়েছে। ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলতার ফলে সুদ পরিশোধের খরচ বাড়েছে—২০০৫-০৬ সালে যা ছিল প্রায় ৮৫ বিলিয়ন টাকা, তা ২০২৩-২৪ সালে বাড়ে ১১৪৭ বিলিয়ন টাকায়, এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বেসরকারি খাত, বিশেষ করে এএসএমই উদ্যোগে ঋণগহ্বর সৃষ্টি করেছে (‘ক্রাউডিং আউট’)।

রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ২০০৫-০৬ সালে ইতিবাচক থাকা সত্ত্বেও ২০২৩-২৪ সালে তা নেতিবাচক হয়েছে এবং আর্থিক দুৰ্নীতি, হুন্ডি ও অর্থ পাচারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মাত্র প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবুও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে—এটাই বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক দিক বলে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন।

অর্থমন্ত্রী এসব পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে জোর দিয়ে বলেছেন—দেশকে সঠিক পথে ফেরাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি জরুরি।