সোমবার, ১৩ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

লোকসানে ১৭ ব্যাংক; সিএসআর ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে গেল

২০২৪ সালে দেশের বেশ কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক আর্থিক চাপে পড়ার প্রভাব ২০২৫ সালের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ব্যয়েও পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) মধ্যে দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিএসআর খাতে মোট মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে—আগের বছরের তুলনায় এটি প্রায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪২ শতাংশ কম।

অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর সামাজিক বিনিয়োগ গত এক বছরে খাড়া অনুঘটকে পড়েছে। গত এক দশকে এটি সিএসআর খাতে সর্বনিম্ন ব্যয়; এর আগে ২০১৫ সালে সর্বনিম্ন ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ বছর ২০১৫ সালের তুলনায় ব্যয় প্রায় ১৮২ কোটি টাকা বা ৩৪.৫৭ শতাংশ কমে গেছে।

বহু বছরের ধারাবাহিক রেকর্ড দেখালে দেখা যায় সিএসআর ব্যয় ধীরে ধীরে কমছে — ২০২২ সালে ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৪ সালে ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে পারেনি; যেসব ব্যাংক মুনাফা করেছে, তাদেরও আয় প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। এই আর্থিক দুর্বলতার ফলে সিএসআর বাজেট ছোট করা এবং ব্যয় পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন, ২০২৪ সালের জুন–জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, এরপর সরকার পরিবর্তনের প্রভাব এবং একই সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম ও অর্থ পাচারের তথ্যের বহুল প্রকাশ ব্যাংকিং সেক্টরে বড় ধাক্কা দিয়েছে। কাগজে-কলমে দেখানো মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত আর্থিক চিত্র উন্মোচিত হওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে এবং প্রকৃত লোকসান সামনে আসে। দুর্বল হলে পড়া কয়েকটি ব্যাংক সরকারি উদ্যোগে একীভূত করেও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করা হয়েছে।

ব্যাংকারদের কথায়, রাজনৈতিক চাপও আগে সিএসআর ব্যয়ে বাড়তি ভূমিকা রাখত—শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা ইভেন্টের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুরোধে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হত; অনেকে এমন ব্যয়কে সিএসআর হিসেবে দেখাতেই স্বচ্ছতার সমস্যা দেখা যেত। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি আন্দোলন এবং আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর সেই প্রথা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, ফলে এখন ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে কটা ব্যয় করবেন তা বেশি পরিমাপ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাব বা অনিয়মভিত্তিক ব্যয় সমাজকল্যাণের মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জনফান্ডের অপচয় ঘটায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে, ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করতে হবে এবং তা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ভাগ করে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে—শিক্ষায় ৩০ শতাংশ, স্বাস্থ্যখাতে ৩০ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০ শতাংশ এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে। বাস্তবে তবে এই অনুপাতে ব্যয় হচ্ছে না: ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি, ৩৬ শতাংশ, ‘অন্যান্য’ খাতে ব্যয় করেছে; শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৮.৫৩ শতাংশ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ১০ শতাংশ। স্বাস্থ্যখাতে তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ থাকলেও সরকারি নির্দেশনার কাঠামো অনুযায়ী সামঞ্জস্যের ঘাটতি স্পষ্ট।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচিত সময়ে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে একটাও টাকা ব্যয় করেনি। সেই ব্যাংকগুলো হল— জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

একই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে; এতে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান-এর নাম রয়েছে।

উল্লেখ্য, লোকসানে থাকা ছয়টি ব্যাংক সত্ত্বেও সিএসআর খাতে অর্থ বরাদ্দ করেছে—এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।

সমগ্র পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সুরক্ষা ও সিএসআর নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক বিনিয়োগে স্থায়ী বৃদ্ধি আশা করা কঠিন। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নির্ধারিত নীতিমালা মেনে ব্যয় নিশ্চিতে বিধি-কাঠামো শক্ত করা অপরিহার্য।