প্রায় ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রথম ধাপের অনুমোদন দিল সরকার। বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি ঘাটতি মোকাবেলা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনঃস্থাপন ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থার উন্নয়ন। অনুমোদিত প্রথম ধাপে সরকারের অর্থায়নে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এটি দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
পাঁচটি নদী—ইছামতি, মাথাভাঙ্গা, গড়াই, মধুমতি ও চন্দনা—এর পানি নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যেখানে শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘকাল ধরে পানি সংকট দেখা দিয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২৯০ কোটি কিউবিক মিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যার ফলে কৃষি, মৎস্য ও শিল্পক্ষেত্রে বিপুল সুবিধা স্বরূপ হবে। প্রকল্পের আওতায় গদাগড়, গঙ্গা ও কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পসহ বিভিন্ন নদীর উপর পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পাশাপাশি, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নদীগুলোর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। এর ফলে দেশের ২৮ লাখের বেশি কৃষিজমিতে সেচের সুবিধা নিশ্চিত হবে।
অতীতে বারবার দেখা গেছে, উজানের পানি প্রত্যাহারের মাধ্যমে তেমন পানির প্রবাহ বজায় থাকেনি, যার কারণে নদী ও খালগুলো লবণাক্ত হয়ে পড়ে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি ১১৪ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, গ্যাস পাইপলাইন ও উপগ্রহ শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বছরে প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান ও ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১২ কোটি ২৫ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যেখানে ৪৮ হাজারের বেশি শ্রমিক সরাসরি কাজের সুযোগ পাবেন। এছাড়া, বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক উপকারিতা আসবে, যা দেশের মোট অর্থনীতি বা জিডিপিতে শতকরা শূন্য দশমিক ৪৫ ভাগ অবদান রাখবে। সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষা এবং লবণাক্ততা কমানোর মাধ্যমে সমুদ্রের প্রভাবে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রাকৃতিক কারণে মাঝে মাঝেই দেখা যায়, ১৯৬১ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকে উজান থেকে পদ্মা নদীর প্রবাহ কমে যায়, যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অনেকটাই কমে যায়। এর ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও কৃষি ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে গঙ্গার পানি ভাগাভাগি চুক্তি অনুযায়ী এই তঠের মেয়াদ চলতি বছর শেষ হচ্ছে, ফলে ভবিষ্যতে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে।
এর আগে, এই প্রকল্পটি ১৯৬০ সালের দশকে প্রথম ভাবনা হিসেবে উঠে আসে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৬১ সালে প্রাথমিক ধারণা ও সমীক্ষা শুরু করে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক সমীক্ষা ও পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়। ২০১৬ সালে দুই দেশের কর্মকর্তারা সম্মিলিতভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন ও আলোচনা শুরু করেন। অবশেষে, শুক্রবার একনেকের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যার মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন এক নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাবে।





