সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ভারতের অনুমোদন নেই, নেপাল আগামী ১৫ জুন থেকে বাংলাদেশে সরাবে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

নেপাল ভারতের অনুমোদন না পাওয়ায় আগামীকাল সোমবার ১৫ জুন থেকে বাংলাদেশে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করবে — এমনটি জানিয়েছে নেপালের জ্বালানি কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট রপ্তানির পরিকল্পনা থাকলেও ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) এখন পর্যন্ত তা অনুমোদন দেয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। খবরটি প্রথম প্রকাশ করেছে নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট।

নেপালের কর্মকর্তারা বলেন, মূল বাধা হলো ভারত-বাংলাদেশ সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা। সঞ্চালন লাইনে জমা বাড়তি লোড রাখতে সক্ষমতা না থাকায় এনভিভিএন (এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যবসা নিগম লিমিটেড) ভারতের সিইএর কাছে অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য অনুমোদন চাইলে তা মঞ্জুর হয়নি। পাশাপাশি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সংশোধন ও নেপাল-ভারত জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটির (জেএসসি) কিছু সিদ্ধান্তও এখনো নেয়া হয়নি — এসব প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় রপ্তানি বাড়ানো স্থগিত রয়েছে।

নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির (এনইএ) বিদ্যুৎ বাণিজ্য বিভাগের পরিচালক থার্কা বাহাদুর থাপা বলেন, ‘এই মৌসুমে আমরা বাংলাদেশে কেবল ৪০ মেগাওয়াটই রপ্তানি করবো। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের জন্য ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্ন হয়নি এবং ভারতের সিইএর মাধ্যমে অতিরিক্ত বরাদ্দও পাওয়া যায়নি।’

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত নেপাল-ভারত জেএসসির বৈঠকে নীতিগতভাবে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াটের ওপর অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট রপ্তানি বাড়ানোর সম্মতি হয়েছিল এবং প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার কথাও বলা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী এনইএ এনভিভিএনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের ব্যবস্থা চেয়েছিল। তবে এনভিভিএন জানায় যে ভারত-বাংলাদেশ সঞ্চালন লাইনের মোট সক্ষমতা ১,০০০ মেগাওয়াটের মধ্যে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের জায়গা নেই।

প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে নেপালে অনুষ্ঠিতব্য জেএসসি বৈঠক এবং সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি)। কিন্তু এসব বৈঠকের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এর আগেও ৪০ মেগাওয়াট রপ্তানির ব্যবস্থা জেএসসির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারির বৈঠকে ভারতের আমদানি-রপ্তানি নীতির অধীনে ভারতের সঞ্চালন ব্যবস্থার ব্যবহার করে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট রপ্তানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর এনইএ, এনভিভিএন ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) — এই তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির কাঠামো তৈরি করা হয়।

পরবর্তী পর্যায়ে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর নেপাল-বাংলাদেশ জেএসসি বৈঠকে চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং ৩ অক্টোবর এনইএ, বিপিডিবি ও এনভিভিএনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করা হচ্ছে। যদি অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট অনুমোদন পায় এবং নতুন ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্ন হয়, তাহলে নেপালের মোট রপ্তানি বাংলাদেশে বেড়ে দাঁড়াবে ৬০ মেগাওয়াট।

নেপাল ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথমবার বাংলাদেশে ১২ ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ রপ্তানি করে। রুট হিসেবে বিদ্যুৎ ঢালকেবার–মুজাফফরপুর ৪০০ কেভি লাইনের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করে এবং তারপর বাহারামপুর–ভেড়ামারা ৪০০ কেভি লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পৌঁছে।

বর্তমানে অনুমোদিত ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেপালের ত্রিশূলী ও চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপন্ন হচ্ছে। এই প্রকল্পগুলো ভারতেও রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে; কিন্তু ওই একই প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট রপ্তানির জন্য ভারতের আলাদা অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন হবে।

মূল্য নির্ধারণে নেপাল বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬.৪০ মার্কিন সেন্টে বিক্রি করছে এবং কর্তৃপক্ষ জানায় অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের ক্ষেত্রেও একই মূল্য প্রযোজ্য থাকবে। এ পর্যন্ত নেপাল ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে মোট ১,১৬৫ মেগাওয়াট রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। ভারতের বাজারে নেপাল বিদ্যুৎ বিক্রি করে ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জের ডে-অ্যাহেড ও রিয়েলটাইম মার্কেটে প্রতিযোগিতামূলক দামে এবং এনভিভিএনের সঙ্গে মধ্যমেয়াদি (মিড-টার্ম) চুক্তির মাধ্যমে। ভারতের সঙ্গে লেনদেন ভারতীয় রুপিতে হয়, আর বাংলাদেশের সঙ্গে লেনদেন মার্কিন ডলারে করা হচ্ছে।

পাঠানুষ্ঠান তথ্য অনুযায়ী, ভারত প্রথমবার ২০২১ সালের অক্টোবরেও নেপাল থেকে ৩৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি অনুমোদন করে। পরে ধাপে ধাপে অনুমোদন বাড়িয়ে নেপালকে ভারতীয় বাজারে প্রায় ১,২০০ মেগাওয়াট রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়। চলমান অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ভারত ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে নেপালের আয় হয়েছে ২০.৯৯৫২ বিলিয়ন রুপি, যা আগের আর্থিক বছরের একই সময়ের ১৩.১০৩৩ বিলিয়নের তুলনায় বেশি।

সারকথা, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে রপ্তানি বাড়াতে হলে নেপালকে ভারতের সিইএর অনুমোদন এবং তদনুসারে নতুন ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ও জেএসসি/জেডব্লিউজির সম্মতি নিতে হবে। যতক্ষণ না এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, ততক্ষণ ১৫ জুন থেকে বাংলাদেশে রুপান্তরিত বিদ্যুৎ সীমাবদ্ধই থাকবে—প্রতিবছর নির্ধারিত ৪০ মেগাওয়াটেই।