জাতীয় প্রেসক্লাবে বুধবার অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট সংখ্যালঘু সনাতন সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক হামলা, নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। একই সঙ্গে তারা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সাত দফা দাবি উত্থাপন করে এবং জাতীয়ভাবে উত্থাপিত আটদফা দাবির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসম্পাদক অপর্ণা রায় দাস লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি বলেন, গত মে থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে, যা তাদের মধ্যে ব্যাপক ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
অপর্ণা দাস বলেন, সম্প্রতি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর মন্দির ভাঙচুর, লুটপাট, নির্মম হামলা ও সামাজিক নিপীড়নের ঘটনা বেড়েছে। তিনি ডিপু দাসকে পুড়িয়ে হত্যাকে ‘‘মব জাস্টিস’’-এর ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া সিলেটে খগেন্দ্র দাস নামে এক দোকানদারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে আক্রমণ, শরীয়তপুরে শিক্ষক সুজিত কর্মকারকে লাঞ্ছনা এবং ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের এক শিক্ষককে অপদস্থ করার ঘটনাও তুলে ধরা হয়।
সংগঠনের প্রতিবেদন অনুযায়ী বগুড়া, পিরোজপুর, মাদারীপুর ও চট্টগ্রামে মন্দিরে ভাঙচুর ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। হবিগঞ্জে এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, চট্টগ্রাম ও মাদারীপুরে হত্যাকাণ্ড, ঠাকুরগাঁও ও যশোরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে দেশত্যাগের হুমকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কমিটির পক্ষে অপর্ণা রায় দাস যে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন, তার সারমর্ম হলো:
– সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করা;
– মব জাস্টিসে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে গ্রেপ্তার করা;
– মন্দির, মঠ ও শ্মশানসহ দেবোত্তর সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং সংস্কার কাজ দ্রুত করানো;
– ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ প্রদান করা;
– সংখ্যালঘু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকরি কমিশন গঠন করা;
– ধর্মীয় বিদ্বেষ উসকানি বা বিভাজন সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া;
– শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় কারণে শিক্ষক লাঞ্ছনা বন্ধ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
এ ছাড়া তারা সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, হিন্দু ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তর, দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রার্থনার স্থান নিশ্চিতকরণ, সংস্কৃত ও পালি শিক্ষার আধুনিকীকরণ ও দুর্গাপূজায় সরকারি ছুটি পাঁচ দিনে উন্নীত করার মতো জাতীয়ভাবে উত্থাপিত আটদফা দাবিরও পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।
ফ্রন্টের নেতারা স্মরণ করিয়ে দেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ ও ধর্মীয় উৎসবকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, যা সনাতন সমাজ এখনও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখে। তাদের দাবি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ঢাকা-১৭ আসনের মঠ-মন্দির ও শ্মশানের সংস্কার এবং নতুন মন্দির নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন।
সংগঠনের নেতারা বলেন, ‘‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’’—এই নীতির বাস্তবায়নই তাদের চাওয়া। তারা নাগরিক হিসেবে সমঅধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা দাবি করেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ উগ্রবাদ মোকাবিলা করে একটি অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
সংস্থা অভিযোগ করে, কিছু অসাধু গোষ্ঠী সরকারি ভাবমূর্তি নষ্ট করে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। ফলে সংগঠন নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার বসু, সহসভাপতি গৌতম মিত্র, সুবীর দত্ত, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক সীমান্ত দাস প্রমুখ।





