গত কয়েকদিনে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে বহু দেশেই তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে এবং ফ্রান্সে স্বাভাবিক সময়ের অনুপাতে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থা পাবলিক হেলথ ফ্রান্স জানিয়েছে, ২৪ জুনের পর থেকে একই সময়ের গত বছরগুলোর তুলনায় প্রায় এক হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে; তাঁদের আনুমানিক ৮৫ শতাংশই ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী।
সংস্থাটি বলেছে, যেখানে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা ছিল, সেগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে—বিশেষ করে প্যারিসের আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে বাড়ি থেকেই মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ মনে করিয়ে দিয়েছে, এই তথ্য এখনও প্রাথমিক; বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
কয়েকটি এলাকার পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছে। এএফপি ও রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আল্পস পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় নতুন রেকর্ড এসেছে। জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট প্রদেশের ময়েকার্ন-ড্রেভিৎসে তাপমাত্রা ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়, যা আগের দিনের ৪১.৩ ডিগ্রির রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছে।
ডেনমার্কে আরহুসের কাছে ৩৭ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে—এটি দেশে তাপমাত্রা মাপা শুরু হওয়ার (১৮৭৪) পর সর্বোচ্চ। চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগের উত্তরে ৪০.৯ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে, আর স্লোভাকিয়ার ব্রাতিস্লাভায় শুক্রবার ছিল স্বল্প ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ রাত। সুইজারল্যান্ডেও জুনের রেকর্ড ভাঙেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তীব্র তাপপ্রবাহ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া প্রায় অসম্ভব হত; বিশেষত রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এত বড়ভাবে ঘটার সম্ভাবনা দুই দশক আগের তুলনায় অনেক গুণ বেড়ে গেছে। জার্মান গ্রিন পার্টির সাবেক নেতা ক্যাটরিন গ্যোরিং-একহার্ট সামাজিকমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘এটি আর মনোরম গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া নয়—এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট।’’
বার্লিনে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি ছোঁয়ার সময় কিছুটা স্বস্তি দিতে পুলিশ দুইটি জলকামান মোতায়েন করেছিল। ইউরোপজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে; জার্মানির অনেক এলাকায় চরম তাপ সতর্কতা, পোল্যান্ডের অধিকাংশে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে।
তাপপ্রবাহের প্রভাব অবকাঠামোতে পড়তে শুরু করেছে—রেলপথ ও সড়ক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা গেছে। জার্মান রেলওয়ে ডয়চে বান যাত্রীদের আগামী সপ্তাহের শুরু পর্যন্ত দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল করার সুযোগ দিয়েছে এবং কিছু রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। হামবুর্গের কাছে একটি ব্যস্ত মহাসড়কের লেনে ফাটলের কারণে সেটিও আংশিকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
শিল্প ও শক্তি খাতেও প্রভাব পড়েছে—হাঙ্গেরির দানিয়ুব নদীর পানি গরম হওয়ায় পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক রিঅ্যাক্টর উৎপাদন কমিয়েছে; আগে সুইজারল্যান্ডের বেজনাউ কেন্দ্রও নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করেছিল।
ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শনিবার ও রোববার মিলান, রোম, তুরিন, ভেনিস, জেনোয়া, ফ্লোরেন্স, বোলোনিয়া সহ ১৮টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। পো নদীর পানিপ্রবাহ হ্রাসে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি অনেক ভেতরে ঢুকছে—এটি কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি।
আল্পস অঞ্চলেও রাতে তাপ সামান্য কমেনি; দক্ষিণ টাইরলের বোলজানো শহরে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৫.৪ ডিগ্রি ছিল, যা জুনের নতুন রেকর্ড। পরিবেশবিদরা হিমবাহগুলোর ভবিষ্যত নিয়েও উদ্বিগ্ন। সংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ইভেন্টেও প্রভাব পড়েছে—স্বাধীনতা ও জনসমাগমে অতিরিক্ত পানি ও চিকিৎসা কর্মী মোতায়েন, কিছু প্রদর্শনী ও রেসে সময়/দূরত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বায়ুমন্ডলে একটি ওমেগার মতো উচ্চচাপের অবস্থান বা ‘‘ওমেগা ব্লক’’ তৈরি হওয়ায় গরম বাতাস দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপে আটকে আছে। তবে পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, সপ্তাহান্তের পর এই চরম তাপপ্রবাহ ধীরে ধীরে কমতে পারে এবং অনেক জায়গায় বজ্রসহ ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল, তাই কর্তৃপক্ষ ও জনগণকে সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার আহ্বান করা হচ্ছে।





