মঙ্গলবার, ৩০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সংসদ তোষামোদের স্থান নয়; ট্যাক্সের টাকায় চরিত্রহনন চলবে না: ডা. শফিকুর

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে ব্যক্তিকে তোষামোদ করে গান-কবিতা বা অন্যান্য অনাবিল প্রশংসার সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে বন্ধের অনুরোধ করেছেন। संसद তাঁর মতে তোষামোাছড়া-আচরণের জায়গা নয়, বরং জনগণের নীতিমালা ও দায়িত্ব পালনের জায়গা—এবং ট্যাক্সদাতাদের অর্থ দিয়ে যেন কারো চরিত্র হনন করা না হয়, সেই দাবিই তিনি স্পিকারের কাছে জানিয়েছেন।

সোমবার (২৯ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, সংসদে কেউ গান, কবিতা বা ব্যক্তিগত প্রশংসায় সময় নষ্ট করলে তা ‘ব্যাড কালচার’ এবং এটা বন্ধ করা জরুরি।

ডা. শফিকুর আরও বলেন, সংসদ দায়িত্বের স্থান—এখানে আমাদের কাজ জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। সরকারি দল হোক বা বিরোধী দল, চিন্তার এককোদৃষ্টিভঙ্গি থাকা সম্ভব নয়; তা থাকলে এত লোক সেখানে থাকা প্রয়োজনই পড়ত না। আমরা সবাই জনগণের ভোটে এসেছি; তাই প্রতিটি সংসদ সদস্যের দায়িত্ব রয়েছে নিজের বিবেক, মহান আল্লাহ এবং দেশের মানুষদের কাছে জবাবদিহি থাকা।

বাজেট অধিবেশনকে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেশন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অধিবেশনের ভিত্তিতেই বছরব্যাপী রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড নির্ধারিত হয়, তাই এখানে দেওয়া বক্তব্যও দায়বদ্ধতার পরিচয় হওয়া দরকার।

তিনি দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মহান নেতাদের স্মরণ করে মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান—মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী, আ স ম আবদুর রবসহ স্বাধীনতার বিভিন্ন সংগঠকদের অবদান তুলে ধরেন। ৯০-এর গণআন্দোলন, ২৮ অক্টোবর, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং সাড়ে ১৫ বছরের নিষ্ঠুর শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় শহীদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা জানান। পিলখানায় নিহত বীর সেনাদের জন্য দোয়া করে তাদের ত্যাগকে জাতির কাছাকাছি স্থাপন করেন।

নিজের দলকে ‘কষ্টে বোকা দল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, দলের অনেক সিনিয়র নেতা হারিয়েছে; মাত্র কয়েকজন বাকি আছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও পঙ্গুতপ্রাপ্তদের পরিবার—সাথে ফ্যাসিবাদী শাসনের ভুক্তভোগীদের প্রতি তিনি সমবেদনা জানান।

সংসদকে যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করে ডা. শফিকুর বললেন, সংসদ মূলত দুটি চাকার ওপর চলে—একটি সরকারি দল, অন্যটি বিরোধী দল। যদি কোনো এক চাকা অকেজো হয়ে পড়ে, পুরো যানবাহন হাঁফিয়ে পড়ে। তাই দু’পক্ষকেই সচল রাখতে হবে; চেষ্টা করা উচিত এমন কোনো কাজ না করা যাতে চাকায় পিন বা পেরেক লাগিয়ে সেটি ভাঙা হয়। সংসদে কুচকুচ করে কাটার পর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মনোভাব ত্যাগ করার আহ্বানও জানালেন তিনি।

সে সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বললেন, বিরোধী দল সরকারকে চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে না, আবার সরকারও ভালো উদ্যোগ এলে বিরোধী দল কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করবে না—সবাইকে যথার্থ সম্মান ও যুক্তির ভিত্তিতে এগোতে হবে।

বাজেটের গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান—সংক্ষিপ্ত সময়ে ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট উপস্থাপন করা কঠিন কাজ। তবু বাজেটে কিছু অনুপস্থিতি বা ত্রুটি থাকতে পারে; সেই খুঁতগুলো টিকিয়ে তুলতে বিরোধী দল ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করবে, যাতে জাতীয় অর্থ যেন অপচয়ে বা অন্যায়ভাবে ব্যবহার না হয়।

তিনি আশা প্রকাশ করেন যে সরকারি ও বিরোধী দল থেকে আসা যৌক্তিক সংশোধনী এবং প্রস্তাবগুলো গ্রহণযোগ্যভাবে বিবেচনা করা হবে, যাতে সংসদের আলোচনা ও প্রস্তাবনাগুলো সময়ের অপচয় হিসেবে মনে না হয়।

একটি কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে বাজেট বছরের মেয়াদ পরিবর্তনের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর বলেন, বর্তমান জুলাই–জুন অর্থবছর থাকার ফলে বছরের শেষের দিকে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সামনে রেখে তাড়াহুড়ো করে কাজ করতে হয়। এর ফলে প্রথম ১০ মাসে যেখানে মাত্র ৪২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়, শেষ সময়ে বাকি কাজ পুঁজি করে করতে গিয়ে অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সে জন্য তিনি জোর দিয়ে বলেন, অর্থবছর জানুয়ারি–ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার ইয়ারে পরিবর্তন করা হলে কাজের গতিশীলতা বাড়বে এবং ক্ষতি কমবে।

শেষে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে বাজেট সংসদে পাশ করালেই কাজ শেষ নয়; বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব বহন করে নির্বাহী বিভাগ ও কর্মকর্তা—তাই তাদের মাধ্যমে জনগণের ট্যাক্সের সঠিক এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি।