শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ভেনেজুয়েলায় দুই জোড়া ভূমিকম্পে মৃত ২,২৯৫; ক্ষতি প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলার

২৪ জুন ভোর ৬:৪ মিনিটে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দেশটির উত্তরাঞ্চল কেঁপে ওঠে—প্রথমটি মাত্রা ৭.২, সঙ্গে মাত্রা ৭.৫—এমন তীব্র কম্পন ভেনেজুয়েলায় ১২৬ বছর মধ্যে দেখা সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই দূর্যোগে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২,২৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে।

ভূমিকম্পে বহু এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে; হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে আশ্রয়কেন্দ্র বা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। বাস্তুচ্যুতদের কাছে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ মারাত্মক সংকটে পড়েছে, ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। উদ্ধার ও ত্রাণকর্মীরা জানাচ্ছেন, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তীব্র।

নাসার স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে প্রায় 58,870টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হতে পারে—সরকারি আনুষ্ঠানিক হিসাবের চেয়ে এই সংখ্যা অনেক বেশি। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) মূল্যায়ন করেছে, ভূমিকম্পে সৃষ্ট প্রাথমিক ক্ষতি প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা আগামি সহায়তার চাহিদার তুলনায় ব্যাপক।

স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই দুর্বল; দীর্ঘ সময়ের অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের অভাব এবং চিকিৎসকদের দেশত্যাগের ফলে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত। কারাকাসের হাসপাতাল দেল ওয়েস্তে-র ট্রমা ইউনিটের প্রধান ডা. ইউজেনিও কোভা বলেন, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন সংক্রমণ—দীর্ঘ সময় দুর্যোগে আটকে থাকা রোগীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে, যা জটিল আঘাতের সঙ্গে মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও তীব্র করে তুলছে।

উত্তপ্ত আবাদি এলাকা ও ধ্বংসস্তূপ যথার্থভাবে ব্যবস্থাপনা করা না গেলে মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, বলে সতর্ক করেছেন লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের জাতিসংঘ মানবিক সংস্থার মুখপাত্র ভেরোনিক দুরো। বর্জ্য ও ধ্বংসস্তূপ অপসারণও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য দ্রুত মোতায়েন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধার ও ত্রাণকর্মে সহায়তার জন্য ৯০০ সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছে, কারাকাসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে মেরামত করেছে এবং উপকূলে নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠিয়েছে। মার্কিন বিদেশ দপ্তর থেকে আরও প্রায় ১০০ জন সমর্থন কর্মী এই তৎপরতায় যোগ দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন now (এ পর্যায়ে) জাতিসংঘ ও বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলাকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে, তবে ইউএনডিপি–র মূল্যায়ন অনুযায়ী এটি মোট চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত।

এই বিপর্যয়ে ইকুয়েডর, ইসরায়েলসহ নানা দেশ থেকে অন্তত ৫০টি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যেই পৌঁছেছে; এমনকি কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এমন দেশগুলোর দলও ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে জানা যায়, ১৯০০ সালের সান নারসিসো ভূমিকম্প ছিল দেশটির ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী লক্ষণীয় কম্পন—মাত্রা আনুমানিক ৭.৬ থেকে ৭.৭—যা তখনও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছিল এবং রাজধানী কারাকাস সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত একটি অঞ্চল ছিল।

দুর্যোগের এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে — তৎপরতায় দ্রুততা আনা, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, ধ্বংসস্তূপ দ্রুত সরিয়ে সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ করা এবং দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয় করা। এসব দ্রুত না হলে আগামী দিনগুলোতে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।