শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পিতা-মাতা ভরণপোষণ না করলে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড

পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা প্রত্যেক সন্তানের আইনগত দায়। এ দায়িত্ব উপেক্ষা করলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

পিতা-মাতা ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ‘পিতা’ বলতে সন্তানের জনক এবং ‘মাতা’ বলতে সন্তানের গর্ভধারিণীকে বোঝায়। ভরণপোষণের আওতায় রয়েছে খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং সামাজিক সঙ্গ—অর্থাৎ শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, মানসিক ও শারীরিক পরিচর্যার নিশ্চয়তাও অন্তর্ভুক্ত।

আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানের ওপর পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা পারস্পরিক আলোচনা করে এই দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করবে। পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না; তাদের জন্য বাসস্থানের সুষ্ঠু বন্দোবস্ত করতে হবে।

এছাড়া সন্তানেরা নিয়মিত পিতা-মাতার স্বাস্থ্যের খবর নেবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করবে। পিতা-মাতা আলাদাভাবে বসবাস করলে সন্তানের দৈনন্দিন বা মাসিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত দিতে হবে।

আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী, পিতার অনুপস্থিতিতে দাদা-দাদি এবং মাতার অনুপস্থিতিতে নানা-নানির ভরণপোষণের দায়িত্বও নাতি-নাতনিদের উপর আরোপ করা হয়েছে। এই প্রব্যাবস্থার মাধ্যমে পারিবারিক দায়িত্ব তিন প্রজন্ম জুড়ে ভাগ করে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ধারা ৫(১) অনুযায়ী ৩ বা ৪ ধারার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা আর জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড হতেও পারে। ৫(২) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণে বাধা দেয় বা সহায়তা না করে, তাহলে তাকেও একই দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন এই আইনকে বাংলাদেশের পারিবারিক মূল্যবোধ ও প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় যুগান্তকারী বলেও অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, আইনের ধারা ৩ প্রজেক্ট করে প্রত্যেক সন্তানের জন্য ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং অভিভাবকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো নিষিদ্ধ করে পারিবারিক বন্ধনকে আইনগত সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

অ্যাডভোকেট খালিদ আরও উল্লেখ করেছেন, ধারা ৫ এ এক লাখ টাকার জরিমানার বিধান দায়িত্বহীন সন্তানদের জন্য কঠোর আইনি বার্তা। ধারা ৪ এর মাধ্যমে দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণের দায়িত্ব নাতি-নাতনিদের ওপর ন্যস্ত করে তিন প্রজন্মের পারস্পরিক দায়িত্ববোধ আরও শক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আইনের ধারা ৮ আপস-মীমাংশার সুযোগ রেখে পারিবারিক বিরোধগুলো আদালতের বাইরে স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তির সুযোগ রাখে, যা আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৩ সালের বিধিমালায় ভরণপোষণ তহবিল ও পরিচর্যা কেন্দ্র গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যা অসহায় প্রবীণদের জন্য নতুন আশার আলোক।

অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন আরও সতর্ক করে বলেছেন যে আইনটি কেবল শাস্তি প্রদানের জন্য নয়, সন্তানদের ওপর তাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্বের কথা স্মরণ করানোর জন্য প্রণীত। আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে পারিবারিক সম্প্রীতি ও প্রবীণদের মর্যাদা-নিরাপত্তা দুটোই সুরক্ষিত হবে।

সূত্র: বাসস