শুক্রবার, ১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

‘সতলুজ’ ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে সরানোর পরে তুমুল বিতর্ক

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভের ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে হঠাৎ করে পাঞ্জাবের বিতর্কিত ছবি ‘সতলুজ’ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনা এবং ক্ষোভ ছড়িয়েছে। মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় দর্শকদের জন্য ছবিটির স্ট্রিমিং বন্ধ করে দেওয়া হয়।

চলচ্চিত্রটি শিখ মানবাধিকারকর্মী জশবন্ত সিং খালরার জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত; মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক দিলজিৎ দোসাঞ্জ। ছবিটি পাঞ্জাবের ১৯৮৪-১৯৯৪ সালের মধ্যে পুলিশি নিখোঁজ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনাগুলোকে উঠে এসেছে—বিশেষ করে খালরার তদন্তে উদ্‌ঘাটিত প্রায় ২৫ হাজার অজ্ঞাত মৃতদেহের কাহিনি।

ছবি আকস্মিকভাবে সরিয়ে নেওয়ার পর দিলজিৎ দোসাঞ্জ সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, “আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না।’’ এক ইনস্টাগ্রাম লাইভে তিনি আগে থেকেই সতর্ক করেছিলেন যে ছবিটি দ্রুত নামিয়ে নেওয়া হতে পারে এবং ভক্তদের বলেন “আপনারা এটি ডাউনলোড করে রাখুন।” রাজস্থানে আকাশের নিচে এক গণপ্রদর্শনীর ভিডিও পোস্ট করে তিনি পাঞ্জাবিতে লেখেন, “এই ছবিটা আর থামানো যাবে না; খালরার কণ্ঠস্বর দমানো যাবে না।”

জি-ফাইভের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুক্তির পর দর্শকদের উত্তর অভিভূত করেছে এবং তারা সৃজনশীল কাজে সমর্থন জানায়—তবে “বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে” ভারতে ছবিটির স্ট্রিমিং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটি জানিয়েছে যে তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছবিটি ভারতীয় দর্শকদের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে। বহির্বিশ্বে ‘জি-ফাইভ গ্লোবাল’ প্ল্যাটফর্মে ছবিটি এখনো দেখা যাচ্ছে।

এই সিদ্ধান্ত পাঞ্জাবের রাজনৈতিক এবং সামাজিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। শিরোমনি আকালি দলের সভাপতি সুখবীর সিং বাদাল ছবিটি সরানোকে “সম্মিলিত স্মৃতি, সত্য এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত” বলে অভিহিত করেছেন। কংগ্রেস নেতা সুখপাল সিং খাইরা অবিলম্বে ছবিটি ওটিটিতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন এবং বলেছেন, ছবিতে দেখানো মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো আদালতেও স্বীকৃত। আম আদমি পার্টির সাংসদ মালবিন্দর সিং কাং কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করে বলেছেন, ছবিটি ব্লক করে সরকার তাদের প্রকৃত চেহারা ‍প্রকাশ করেছে। শিরোমনি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটির প্রধান সচিব কুলবন্ত সিং মানান বলেন, পাঞ্জাবের ইতিহাস নিয়ে এমন ছবি দেখার এবং নিজস্ব মত গড়ার অধিকার জনগণের আছে।

ছবিটি ওটিটিতে মুক্তির আগে তিন বছর জটিল সেন্সর বিজ্ঞানের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল। ২০২২ সালে সিবিএফসি এটি দেখে ১২৭টি দৃশ্য কাটার নির্দেশ দেয় এবং নাম বদলানোর পরামর্শ দেয়; প্রকাশ করা হয়েছিল ‘পাঞ্জাব ৯৫’। প্রযোজকরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন, পরে সেই আপিল প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৩ সালের টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের প্রিমিয়ার থেকেও ছবিটি সরিয়ে নেওয়া হয়। সব বাধা কাটিয়ে অবশেষে ৩ জুলাই ‘সতলুজ’ হিসেবে জি-ফাইভে মুক্তি পায়। পরিচালক হানি ত্রেহান বলেন, থিয়েটার রিলিজের চেষ্টা ব্যর্থ হলে গোপনীয়তার মধ্যে ওটিটি মুক্তির পথ নেয়া হয়েছিল এবং তিনি দাবি করেছেন ছবিটি কোনো কাটছাঁট ছাড়াই স্ট্রিম করা হয়েছিল।

সমালোচকরা এবার প্রশ্ন তুলছেন, দেশের মধ্যে কিছু রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ছবি যেমন ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ (২০২২), ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ (২০২৩) বা ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ (২০২৫) যে ভাবে বাধাহীনভাবে প্রদর্শিত হয়েছে, সেখানে কেন পাঞ্জাবের বাস্তব ঘটনার ওপর নির্মিত মানবাধিকারভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রকে ভারতীয় দর্শকদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে—এতে ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও পক্ষপাতমূলক সেন্সরশিপের অভিযোগ নতুন করে জনমনে জাগছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ছবিটির ভবিষ্যৎ কবে এবং কীভাবে ভারতীয় দর্শকদের কাছে ফেরত আসবে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা নেই। আইনি কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ মিলিয়ে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে—তবে ‘সতলুজ’ নিয়ে উদ্ভূত বিতর্কই স্পষ্ট যে এটি শুধুই সিনেমা প্রসঙ্গে নয়, ইতিহাস, সত্য এবং জনগণের জানার অধিকারকে ঘিরে চলছে।