অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের তাদের টাকা সুদসহ ফিরিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম চলছে এবং কোথাও ‘হেয়ারকাট’ করা হবে না। তবে এসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে লোকসান বয়ে চলায় টাকা ফেরত দিতে কিছুটা সময় লাগবে—এই সতর্কতাও তিনি দিয়েছেন।
বুধবার সংসদে কার্যপ্রণালি বিধি-৭১ অনুযায়ী উত্থাপিত জরুরি নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ অনিয়মের দায়ে অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে এখন বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলছে। ফরেনসিক রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপে সম্পদ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের পাওনা আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দায়ী ব্যক্তির সম্পদ, তহবিলের আয় ও অন্যান্য সম্পত্তি অধিগ্রহণ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ করে তা বিক্রি বা নিলামে তুলে গ্রাহকের টাকা উদ্ধার করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
অপরদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা খেলাপি ঋণের টাকা ফেরত আনার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক তাদের ঋণ উদ্ধার সংক্রান্ত ‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া ৯টি আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘নো উইন, নো ফি’ শর্তে কাজ শুরু করা হয়েছে। অগ্রাধিকারভিত্তিক ১১ চুক্তির প্রথম পর্যায়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়েন্ট গ্রুপের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সংসদে আগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু সরকারের প্রতি প্রশ্ন তোলেন—দেশের কয়েকটি ব্যাংকের লুট হওয়া টাকাকে ৭৫ লাখ গ্রাহকের হাতে দ্রুত ফিরিয়ে দেয়ার এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি দেয়ার দাবিতে তিনি মন্ত্রীর মনোযোগ আকর্ষণ করেন। রানু বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতি ও মালিকপক্ষের অর্থ পাচারের ফলে লক্ষ লক্ষ আমানতকারী তাদের টাকা তুলতে পারছেন না; ব্যাংক মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠান, তাই এর সুরক্ষা জরুরি।
রানু আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকেরা মন্ত্রীর বাড়ির সামনে মানববন্ধন করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে তাদের কষ্ট জানিয়েেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, ‘‘যারা গ্রাহকের টাকা লুট করেছে, তাদের কোনো ক্ষমা হবে না। তাদের যেখানেই থাকুক, ফিরিয়ে এনে গ্রাহকদের টাকা আদায় করতে হবে।’’ তিনি ‘হেয়ারকাট’কে এক ধরনের ‘মরণকাট’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ৭৫ লাখ গ্রাহকের উদ্বেগ দুর করার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা মন্ত্রক কি নিয়ে আছে?
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, তিনি ঘটনাটিকে ‘‘হৃদয়বিদারক’’ হিসেবে দেখেন এবং এটাকে ঠিকভাবে সমাধান করা নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব। তিনি পুনরায় নিশ্চিত করেছেন—ইনশাআল্লাহ আমানতকারীরা তাদের আমানত সুদসহ ফিরে পাবে। তবে তা দ্রুত করতে হলে সময় লাগবে, কারণ এই ব্যাংকগুলো বর্তমানে লোকসানে রয়েছে এবং প্রতিদিনই লোকসান বাড়ছে।
অর্থমন্ত্রী গ্রাহকদের কষ্ট বুঝতে পারছেন বলে জানিয়ে বলেন, অনেকের চিকিৎসা, বিবাহ-খরচসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কারণে টাকা দরকার; সেই জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা চলছে। তার কথায়, ‘‘জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে আমাদের লক্ষ্য তাদের আমানত ও সুদ ফিরিয়ে দেয়া; শুধু একটু ধৈর্য প্রয়োজন। কোথাও ‘হেয়ারকাট’ হবে না।’’
সংক্ষেপে, সরকার ফরেনসিক অডিট ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে দায়ীদের সম্পদ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের আমানত সুদসহ ফিরিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে—তবে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য কিছু সময় লাগবে বলে জানানো হয়েছে।





