শনিবার, ১১ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জি-ফাইভের ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে ‘সতলুজ’ সরানোর পর তীব্র সমাজ-রাজনৈতিক বিতর্ক

জি-ফাইভ ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে পাঞ্জাবকে কেন্দ্র করে নির্মিত বিতর্কিত ছবি ‘সতলুজ’ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় দর্শকদের জন্য ছবিটির স্ট্রিমিং বন্ধ করে দেওয়া হয়। ছবিটি শিখ মানবাধিকারকর্মী জশবন্ত সিং খালরার জীবনী ও তাঁর অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত—মূল ভূমিকায় আছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও শিল্পী দিলজিৎ দোসাঞ্জ।

ছবিটি হঠাৎ করে প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দিলজিৎ। সামাজিক মাধ্যমেই তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছেন, ‘আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না।’ আরও আগে একটি ইনস্টাগ্রাম লাইভে তিনি ভক্তদের বলেছেন, ‘‘আমার মনে হচ্ছে, সোমবারের মধ্যে ছবিটি নামিয়ে নেওয়া হতে পারে। তবে কোনো চিন্তা নেই, আপনারা এটি ডাউনলোড করে নিন।’’

সোমবার রাজস্থানে খোলা আকাশের নিচে প্রজেক্টরে ছবির গণপ্রদর্শনীর ভিডিও শেয়ার করে দিলজিৎ পাঞ্জাবিতে লিখে বলেন, ‘হুন নি রুকনি ফিল্ম। খালরা সাব দি আওয়াজ নু কোই নি দাবা সাকদা।’ — অর্থাৎ, এই চলচ্চিত্র আর থামানো যাবে না, খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বরকে কেউ দমাতে পারবে না।

জি-ফাইভ কর্তৃপক্ষ জানায়, যদিও প্ল্যাটফর্মের গ্লোবাল ক্যাটালগে ছবিটি এখনও দেখা যাচ্ছে, ভারতের ক্যাটালগ থেকে সাময়িকভাবে এটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারা একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছে যে মুক্তির পর দর্শকদের সাড়া অবিশ্বাস্য ছিল এবং তারা ছবিটির সৃজনশীলতাকে সমর্থন করে—তবু চলমান পরিস্থিতি ও আইনগত প্রক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভারতে ছবিটির স্ট্রিমিং স্থগিত থাকবে। জি-ফাইভ আরও জানিয়েছে তারা আইনি পথে চলচ্চিত্রটি যথাসময়ে ভারতীয় দর্শকদের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে।

ছবিটি মূলত ১৯৮৪–১৯৯৪ সালের মধ্যে পাঞ্জাবে পুলিশি নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সেইসব মৃতদেহের শনাক্তকরণ ও সৎকারের লড়াই তুলে ধরে। পরিচালনা করেছেন হানি ত্রেহান; প্রধান চরিত্রে রয়েছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ ও অর্জুন রামপাল।

ছবিটি সরিয়ে দেওয়ার খবর পাঞ্জাবের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরাসরি প্রতিক্রিয়া তুলেছে। শিরোমনি আকালি দলের সভাপতি সুখবীর সিং বাদল মনে করেন, এটি আমাদের যৌথ স্মৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর একটি নির্লজ্জ আঘাত। কংগ্রেস নেতা সুখপাল সিং খাইরা ছবিটি অবিলম্বে পুনরায় প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন এবং বলেছেন, চলচ্চিত্রে যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃশ্য দেখানো হয়েছে তা আদালতের রায়ের সঙ্গেও খানিকটা সঙ্গতিপূর্ণ। আম আদমি পার্টির সংসদ সদস্য মালবিন্দর সিং কাং কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, ছবিটি ব্লক করে তারা বাস্তবের মুখ ঢেকে রাখতে চাচ্ছে। শিরোমনি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটির প্রধান সচিব কুলবন্ত সিং মানান বলেছেন, পাঞ্জাবের ইতিহাসের এই দিকটি দেখার এবং নিজস্ব মত গঠনের অধিকার জনগণের রয়েছে।

এই মুক্তি কিন্ত সহজ ছিল না—চলচ্চিত্রটি ২০২২ সালে ‘ঘাল্লুঘারা’ শিরোনামে কেন্দ্রীয় সেন্সর বোর্ড (সিবিএফসি)র কাছে পাঠানো হলে বোর্ড ১২৭টি দৃশ্য কাটার নির্দেশ দেয় এবং নাম পরিবর্তনের পরামর্শ দেয় (‘পাঞ্জাব ৯৫’)। প্রযোজক প্রথমে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বম্বে হাইকোর্টে আপিল করেন, পরে আপিল প্রত্যাহার করেন। বহু জটিলতা ও ২০২৩ সালের টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব থেকে প্রিমিয়ার বাতিল হওয়ার পর অবশেষে ৩ জুলাই ছবিটি ‘সতলুজ’ নামে ভারতের জি-ফাইভে মুক্তি পায়। পরিচালক জানিয়েছেন থিয়েটার রিলিজ না হওয়ায় গোপনীয়তায় ওটিটিতে মুক্তির পরিকল্পনা করা হয়েছিল; দাবি করা হয়েছে ছবিটি কোনো কাটছাঁট ছাড়াই স্ট্রিম করা হয়েছিল এবং সেন্সর সার্টিফিকেট ছাড়াই মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

জশবন্ত সিং খালরা কেন এই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রবিন্দু, তা বোঝাতে না পারলে ক্ষেত্রে ছবির গুরুত্ব কেমেই বোঝা যাবে না—১৯৯০-এর দশকে খালরা পাঞ্জাব পুলিশের দ্বারা বেওয়ারিশভাবে পুড়িয়ে ফেলা প্রায় ২৫ হাজার মৃতদেহের রহস্য উন্মোচন করেন এবং তাঁর অনুসন্ধানের ফলে শত শত পুলিশ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসে। ১৯৯৫ সালে তিনি অপহৃত হয়ে পুলিশের হেফাজতে খুন হন; ২০০৭ সালে সিবিআই তদন্ত ও পরে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট চার পুলিশ কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন।

সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন যে কেন একই ধরনের বিতর্কিত বা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অন্যান্য ছবি—যেমন ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ (২০২২), ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ (২০২৩) বা ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ (২০২৫)—বাধাহীনভাবে প্রদর্শিত বা স্ট্রিম করা হয়েছে, অথচ পাঞ্জাবের বাস্তব ঘটনা ভিত্তিক এক মানবাধিকার চলচ্চিত্রকে ভারতীয় দর্শকদের নাগালে আনা থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। চলচ্চিত্র অঙ্গনে এটি ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও পক্ষপাতমূলক সেন্সরশিপ নিয়ে নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।