শনিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অনলাইন জুয়ায় দিনে কোটি টাকার লেনদেন, বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন চক্রের নেতা

গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে অনলাইন জুয়া পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৬০০টি এমএফএস (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিমকার্ড; প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে তারা প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত।

চক্রের প্রধান হিসেবে পুলিশের নথিতে নাম রয়েছে মো. আরিফুল ইসলাম (২৩)-এর। বুধবার রাতে গাজীপুরের একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট থেকে আরিফুলসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাকি তিনজনকে কুমিল্লার একটি আবাসিক হোটেল থেকে আটক করা হয়। গ্রেফতারদের মধ্যে অন্য নামগুলোর মধ্যে আছেন মোঃ আরমান হোসেন (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আবদুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ (২৩) ও মশিউর রহমান (২০)।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে ডিবি অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম গ্রেফতারের তথ্য জানান। তিনি জানান, আরিফুলদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৬ হাজার ৬০০টির মতো এমএফএস অ্যাকাউন্ট সম্বলিত সিমকার্ড, ৬৭টি ভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, একটি ল্যাপটপ, ৭০টির বেশি মোবাইল ফোন এবং একটি মাইক্রোবাস। উদ্ধারকৃত ডিভাইসগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে প্রতিদিন কদাচিৎ নয়, নিয়মিতভাবে প্রায় ৫ কোটি টাকা লেনদেনের আলামত পাওয়া গেছে।

আরিফুলকে আগেও গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানায়। অনুসন্ধানে প্রকাশ, অবৈধ উপার্জনের টাকা দিয়ে তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। পূর্বাচলে তার একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তিনি আবারও আরেকটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনে নিয়েছিলেন।

ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম আরও জানান, তারা গ্রেফতারকালে যে রিসোর্টে ছিলেন সেখানে তিনটি রুম বুকিং করেছিলেন আরিফুল। যে রুমে তিনি ছিলেন তার ভাড়া একদিনে প্রায় ৫০ হাজার টাকা; সাধারণত চার-পাঁচ দিন সেখানে থাকতে হতো এবং পরে গোপনে অন্য হোটেলে বা কক্সবাজারের নামি-দামি হোটেলে স্থানান্তর করতেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলতেন।

সংবাদ সম্মেলনে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ডিভিশনের মুখ্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাইবার পর্যবেক্ষণে অনলাইন জুয়ার কয়েকটি ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করা হয়েছে। সাইটগুলোতে লেনদেন চালাতে এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হতো। প্রতিদিনের লেনদেনগুলোর হিসাব শেষে রোজকার লাভ-ক্ষতি সমন্বয় করে এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস পারসোনাল অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হতো। এরপর ওই টাকা ব্যবহার করে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ (বাইন্যান্স, বাইবিট, বিটগেট প্রভৃতি) থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনা হতো এবং শেষপর্যন্ত সেই ক্রিপ্টো অনলাইন জুয়া পরিচালনার মূল কোম্পানির দেওয়া ওয়ালেটে পাঠানো হতো। পুলিশ যে কোম্পানিগুলোর নাম উল্লেখ করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে পে ক্যাশমা, গো পে, লাকি পে, এলকিউ পে, এক্সি পে, কুল পে প্রভৃতি।

ডিবির কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ কেন্দ্রিক অনলাইন জুয়ার সাইটগুলো অধিকাংশই চীনা নাগরিকেরা নিয়ন্ত্রণ করেন। তদন্তে জানা গেছে, চক্রটির মূল নিয়ন্ত্রক নাতান নামের এক চীনা নাগরিক; গো পে নামের কোম্পানির মাধ্যমে চক্রটি কার্যক্রম পরিচালনা করত।

দেশে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অর্থপাচারের পরিমাণ সম্পর্কে তিনি প্রাথমিকভাবে বলেন, “আমাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়ে থাকতে পারে।”

গ্রেফতার হওয়া ছয়জনকে আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের পুলিশরিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম-কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান। তিনি আরও জানান, ওয়েবসাইটগুলোর নিয়ন্ত্রণ মূলত চীনা নাগরিকদের হাতেই; স্থানীয় চক্রগুলো কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করে।

পুলিশ এখনও আরও অনুসন্ধান চালাচ্ছে—কন্ট্রোলারদের খোঁজ, আর্থিক যোগাযোগের পূর্ণ চেইন বের করা এবং অন্তর্ভুক্তির পরিধি নির্ণয় করা হচ্ছে। তদন্ত চলছে, প্রয়োজন হলে আরও গ্রেফতারী অভিযান চলবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।