রবিবার, ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নতুন দিগন্তের সূচনা: সিলেটে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

সিলেট জেলা স্টেডিয়াম আজ সার্বিকভাবে অংশগ্রহণ-উৎসবের রূপ ধারণ করেছিল। সাধারণত সুনসান স্টেডিয়াম আজ যেন জীবন্ত হয়ে উঠল—কানায় কানায় ভরা গ্যালারি, মাঠে খুদে ক্রীড়াবিদদের প্রাণবন্ত প্রদর্শনী, সতর্ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংবাদকর্মীদের ব্যস্ত ভিড়। সবকিছু মিলিয়ে ছিল একটাই উপলক্ষ্য: নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন।

শনিবার (০২ মে) বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে সিলেটে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিকেল ৫টা ৮ মিনিটে নিজে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটির শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধন ছাড়া শুধু সিলেট নয়—দেশের জেলা স্টেডিয়ামগুলোতেও ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন হাজারো খুদে ক্রীড়াবিদ।

উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে বলেন, আগামী দিনের দায়িত্ব নিতে হবে তাদেরই; তাই পড়াশোনা ও খেলাধুলা দুটোই সমান গুরুত্ব পাবে। খেলাধুলার মাধ্যমে দেশের সুনাম বাড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি।

সরকার এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সারাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রতিভা অন্বেষণ শুরু করেছে। তৃণমূল পর্যায় থেকেই মেধাবী ক্রীড়াবিদদের শনাক্ত করে গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

এ প্রসঙ্গে স্মরণ করানো হয়—নতুন কুঁড়ি ধারাবাহিক অনুষ্ঠানটি ১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করে; বাংলাদেশের টেলিভিশনের আশির দশকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বহু প্রতিভা তখনই দেশের সামনে আসে। বহু বছর পর এই পরিচিত নাম ফিরে এসেছে—তবে এবার মঞ্চ নয়, সবুজ মাঠ-গালিচায় নতুনত্ব নিয়ে। নতুন আঙ্গিকে আত্মপ্রকাশ করলো ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’।

ঢাকা থেকে ছুটে এসেছেন বিভিন্ন বিভাগের দেশের সেরা ৩২ জন খেলোয়াড়, যারা এই অনুষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে অংশ নিয়েছেন। তারা বিভিন্ন খেলায় দেশের নাম করে চলা খেলোয়াড়—ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি সহ নানা খেলার প্রতিনিধিরা সবাই এক ছাতার তলে এনেছেন আগামীর তারকাদের প্রতি উৎসাহ।

সরকারিভাবে ক্রীড়া পেশাকে প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির কথাও আনা হয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের দলীয় ইশতেহারে ক্ষমতাসীন সরকার ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; কর্তৃপক্ষ দাবি করছেন, এখন সেই অঙ্গীকারটি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশসেরা খেলোয়াড়দের মাঝে ক্রীড়া কার্ড বিতরণ করা হয়েছে এবং ক্রীড়াভাতা চালু করা হয়েছে—যা অ্যাথলেটদের আর্থিক সহায়তা দেবে এবং ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনের আগেই ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রীর স্পোর্টসকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল এবং তা বাস্তবায়নের কাজ এখন চলছে। তিনি উল্লেখ করেন যে সরকার ক্রীড়া কার্ড ও ক্রীড়াভাতা চালু করেছে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠান ঢাকার বাইরে সিলেটে আয়োজন করার পেছনে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘ঢাকার বাইরে থেকে শুরু করাই চাই—সবসময়ই ঢাকার মাধ্যমেই বড় আয়োজন শুরু হয়; diesmal আমরা বাইরে থেকে শুরু করছি।’ নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিলেটে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়েছে।

প্রতিযোগিতার কাঠামো সম্পর্কে জানানো হয়েছে—১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে মোট ৮টি জনপ্রিয় ইভেন্টে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। কর্মসূচি উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে শেষ হবে। আঞ্চলিক পর্বের খেলা ১৩-২২ মে’র মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।

দেশকে ১০টি শক্তিশালী অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে—ঢাকা, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ। প্রতিটি অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং প্রতিটি পর্যায়ে শক্তিশালী প্রশাসনিক ও বাস্তবায়ন কমিটি পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করবে, যাতে কোনো মেধা অবমূল্যায়িত না হয়।

খেলা-প্রকরণের বর্ণনা অনুযায়ী ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি ও ব্যাডমিন্টন দলের ক্ষেত্রে নকআউট পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। দাবায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সুইস লিগ পদ্ধতি থাকবে। ব্যক্তিগত ইভেন্ট—অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার ও মার্শাল আর্টে প্রাথমিক বাছাই (হিট/নকআউট) ও ফাইনাল রাউন্ডের মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণ করা হবে। এক খেলোয়াড় সর্বোচ্চ দুটি খেলায় অংশ নিতে পারবে।

রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ ছিল অল্প—১২ থেকে ২৬ এপ্রিল। তত্ক্ষণাত সারা দেশ থেকে আট ইভেন্টে মোট ১,৬৭,৬৯৩ জন প্রতিযোগী নাম লিখিয়েছেন। এদের মধ্যে ছেলে ১,২০,৯৪৯ জন এবং মেয়ে ৪৬,৭৪৪ জন। অঞ্চলভিত্তিতে ঢাকা থেকে সর্বোচ্চ রেজিস্ট্রেশন—২৫,৩৮৭ জন; সবচেয়ে কম রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ময়মনসিংহে, সেখানে ৭,৯৬৬ জন নাম রেখেছেন।

উদ্বোধনী দিন স্টেডিয়ামে উৎসাহ-উদ্দীপনা স্পষ্ট ছিল; অনেক অভিভাবক ও স্থানীয়রা পরবর্তী রাউন্ডে তাদের সন্তানদের অংশগ্রহণের জন্য আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে ফিরেছেন। আয়োজনকারীরা জানিয়েছেন, এই প্রতিযোগিতা থেকে উঠে আসা প্রতিভারাই ভবিষ্যতে দেশের ক্রীড়া অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করবে—এটাই এবারের মূল লক্ষ্য।