সোমবার, ৪ঠা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সংস্কার নিয়ে বিএনপি সরকার প্রতারণা করছে; ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, সংস্কার নিয়ে বিএনপি সরকার ভোটের সময় জনগণের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে প্রতিশ্রুতিতে তারা থাকেনি—এবং সেটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। সরকারের এভাবে চললে তা কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবে; এজন্য ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে রাজনৈতিকভাবে বাধ্য করা প্রয়োজন।

রোববার (৩ মে) রাজধানীর কাকরাইল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনে এসব মন্তব্য করা হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির সহ-প্রধান সারোয়ার তুষার। প্যানেলিস্ট ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী এবং সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান। সেশন পরিচালনা করেন জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।

হান্নান মাসউদ বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনের পরই স্পষ্ট হয়ে গেছে এটি একটি ‘প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার সংসদ’—কারণ যে আইনগুলো সরকারকে শক্তিশালী করবে সেসব জোর করে পাশ করা হয়েছে, কিন্তু যেগুলো সরকারকে জবাবদিহি করবে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় প্রতিনিধিদের সরানোর জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল; বর্তমান নির্বাচিত সরকার সেটি আইনে পরিণত করেছে, যার ফলে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের কোন ব্যাখ্যা ছাড়া অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পুলিশের যেমন কমিশনের কথা বিএনপি প্রস্তাব করেছিল, সেটি করা হলেও সরকার পরে তা পছন্দ করছে না এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো বাতিল করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত প্রস্তাবনাও বাতিল করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করিয়ে দেন, ১৯৯১ সালে যে সংস্কারগুলো রাজনৈতিক দলের মিলিত প্রস্তাবে উঠে এসেছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেগুলো বাস্তবায়ন করেনি। ২৪-এর অভ্যুত্থানের পর যে প্রকল্পগুলো সাজানো হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবে প্রতারকভাবে ভেস্তে দেওয়া হয়েছে—তিনি বললেন দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এলিট, সিভিল-মিলিটারি-বুরোক্রেসি ক্ষমতা ছাড়তে চায় না, তাই সংস্কারকে ঠেকানো হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যদি কোনো উন্নত দেশের পার্লামেন্টে এমন বক্তব্য দিতেন, সেদিনই পদত্যাগ করতে হতো।

সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান ‘জুলাই সনদ’কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনন্য বরননা করেছেন। তার ভাষ্য, সনদের মূল দিক হলো বিচার, শাসন ও নির্বাহ—এই তিন প্রধান অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা। সংবিধান সংস্কার কমিটির প্রাথমিক প্রস্তাবগুলো অনেক অংশেই র‌্যাডিক্যাল ছিল—উদাহরণ হিসেবে একই ব্যক্তি সরকারপ্রধান ও দলের প্রধান না হওয়া—কিন্তু রাজনৈতিক চাপে কিছু বিষয় কম্প্রোমাইজ করা হয়েছে। তবু যে অর্জনগুলো রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে, সেগুলোও বড় অর্জন ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, বিএনপি সরকার বাস্তুচ্যুত হয়েছে—তা সংস্কার করতে ইচ্ছুক নয়। তিনি বলেন, অনেকেই বিএনপিকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দেবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে সরকার সংস্কার থেকে সরে এসেছে।

তুষার আরও অভিযোগ করেন, সরকার সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করে ভোটের ইশতেহার ভঙ্গ করেছে; এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলেন, কোনো সরকার বলে বলে নেয় যে ‘আমরা সরকার, তাই সব জায়গায় আমাদের লোক বসাবো’—কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসানো গ্রহণযোগ্য নয়।

সেশন সভাপতি আখতার হোসেন বলেছিলেন, বিএনপি স্বাধীনতা ও সংস্কার করতে চায় না; তারা ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ উপভোগ করতে চায়। তিনি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সম্পর্কে বলেন, মূল বিষয়ে ব্যাপক ঐক্যমত্য আছে; যদি কারও ভিন্ন মত থাকে, সেটাও পাশবত উপস্থাপন করা হবে—তাই স্বতন্ত্র মত প্রকাশের বহুমাত্রিকতা নীতি অনুযায়ী সুস্পষ্ট। গণভোট-সংক্রান্ত চারটি প্রশ্নে বিএনপির আপত্তি কিসের ওপর, সেটি পরিষ্কার করতে হবে—কারণ গণভোটে প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে অনেকটি সম্পর্কে সব পক্ষই একমত ছিল।

অবশেষে বক্তারা সম্মত হয়, যদি সরকার বাস্তবে সংস্কার কার্যকর না করে এবং প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যায়, তাহলে প্রশাসনিক ও সমাজিক চাপে বিএনপিকে ‘জুলাই সনদ’ তথা সংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে—কেবল কথাতেই নয়, বাস্তব পরিবর্তনের মাধ্যমে।