আগামী অর্থবছরের বাজেটের জন্য দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন প্রকল্প এবং অর্থনীতি সচল রাখতে সরকার নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো করের পরিমাণ বাড়ানো ও কর ছাড়ের সুবিধা কমানো। পাশাপাশি, সম্পদ মালিকদের ওপর করের চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও ভ্যাটের আওতা বিস্তৃত করা হবে। বাজেটের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমানে বাজেটে রাজস্ব ঘাটতি কমাতে এবং আন্তর্জাতিক ঋণের শর্ত পূরণের জন্য করের আওতা ও সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এর ফলস্বরূপ, এ বছর সরকারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড- এনবিআর এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করবে। এর মধ্যে, সবচেয়ে বেশি রেভিনিউ আসবে স্থানীয় পর্যায়ের মূসক (মূল্য সংযোজন কর), আয়কর, এবং ভ্রমণ কর থেকে, যা মোট লক্ষ্যের ৭৪ শতাংশ। এছাড়া, আমদানি-রপ্তানির ওপর শুল্ক কর থেকে ২৬ শতাংশ রাজস্ব আদায় করা হবে।
একটি বড় পরিবর্তন হলো, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যক্তির জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এছাড়াও, ব্যাংক জমার ওপর ৫ লাখ পর্যন্ত কোনও আবগারি শুল্ক আরোপ করা হবে না। এর পাশাপাশি, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়, যেখানে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আলোচনা চলে।
বাজেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন চাল, ডাল, চিনি, খেজুরসহ অন্যান্য পণ্যের ওপর উৎসে কর একই থাকছে, অর্থাৎ ৫০ শতাংশের পরিবর্তন হয়নি। তবে, সম্পদ কর চালু করা হচ্ছে, যেখানে ১ শতাংশ হারে আবাদিরোপে কর বসানো হচ্ছে। অন্যদিকে, অনলাইন গেমিং থেকে আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ উৎসে কর আরোপের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও টেকসই বাজেট পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, দামী বৈদ্যুতিক প্রাইভেটকার ছাড়া অন্যান্য বৈদ্যুতিক গাড়ির কর কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিলাসবহুল এবং ৩৫ লাখ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার গাড়ির অগ্রিম আয়কর বাড়িয়ে ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়, ১৫০০ সিসির বাইক ও মোটরসাইকেলেও সম্ভাব্য কর বৃদ্ধি হতে পারে।
নতুন আইনের মাধ্যমে, কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মদেও ভ্যাট আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, ব্যাংক এ্যাকাউন্ট খোলার জন্য লাগবে বিআইএন নম্বর, যা এখন থেকে দ্রুত পাওয়া যাবে এবং ভ্যাট অফিসের অনুমোদন লাগবে না। মারাত্মকভাবে, মোটরবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপরও অগ্রিম কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করা। এর পাশাপাশি, অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা রেভিনিউ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্পদ কর চালু করাসহ, জমি ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য নির্ধারণে বাজারভিত্তিক বা মৌজামূল্য ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হলো, ‘বাংলা টেসলা’ বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর কর আরোপ, যেখানে বার্ষিক ৫ হাজার টাকা অগ্রিম কর নির্ধারিত হতে পারে। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকাতেও এই করের আওতা আনা হতে পারে, সঙ্গে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হবে।
এছাড়াও, মোটরসাইকেল চালকদের উপর ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ আশরাফ হোসেন খান বলেন, ‘‘সরকার যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে উন্নয়নে ব্যয় করে তাহলে জনগণ স্বয়ং কর দিতে এগিয়ে আসবে। সরকারের ব্যয় যেন জবাবদিহিতার সঙ্গে হয়, তখন মানুষ করের গুরুত্ব বুঝবে ও দিতে উৎসাহিত হবে।’’
এছাড়াও, এনবিআর ছোট ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনছে। প্রায় ২০ লাখ ছোট ব্যবসায়ী এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবে, যেখানে তাঁদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা টোকেন ভ্যাট নেওয়া হতে পারে। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ মন্তব্য করেন, ‘‘বিক্রেতারা দীর্ঘদিন ধরে লস দেখাচ্ছে, তাই তাঁদের জন্য কর ও ভ্যাট প্রদানের এই অঙ্গীকার জরুরি।’’





