শুক্রবার, ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিদ্রোহে তৃণমূল: রাজ্যের সব সাংগঠনিক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতের দল তৃণমূল কংগ্রেস অচল অবস্থা থেকে ভেঙে পড়েছে—এমন ধারণা দিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে জন্ম নিল মমতা-হীন ‘আসল তৃণমূল’। বিদ্রোহী বিধায়কদের মহারাষ্ট্র মডেলের জোট বেঁধে চলার পর দলীয় নেতৃত্ব পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্যজুড়ে সব সাংগঠনিক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়; তাঁর পক্ষে প্রায় ৫৯ জন তৃণমূল বিধায়ক রয়েছেন বলে বিদ্রোহী শিবির জানিয়েছে। এ ছাড়া ওই গোষ্ঠী স্পিকারের কাছে ঋতব্রতকে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চিঠি জমা দিয়েছে; চিঠিতে মমতা তাকে দলনেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

গত বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরে দলটিতে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। প্রার্থী বাছাই, কৌশল ও সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়েও তিক্ত সমালোচনা ওঠে। অভিযোগ দায়ের ও অভ্যন্তরীণ শাসন নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই দলের অভ্যন্তরীণ বিবাদ তীব্র রূপ নেয়।

বাড়তি উত্তাপ তখন আসে স্বাক্ষর জালের অভিযোগে। দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষে একটি দলীয় রেজলিউশনের চিঠি বিধানসভায় জমা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে; এই অভিযোগের সূত্র ধরে সিআইডি তদন্ত শুরু করে এবং অভিষেককে নোটিশ পাঠানো হয়।

তদন্ত ও অভিযোগের জের ধরে দলের দুই বিধায়ক—ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা—কে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কারের পরে বিদ্রোহী শিবির আরও সক্রিয় হয়; চলতি মাসের ৩১ মে কালীঘাটের মমতার বাড়িতে ডাকা বৈঠকে ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে মাত্র ১৭ জন উপস্থিত থাকায় বৈঠক ভেস্তে যায়। এরই মধ্যে বহিষ্কৃত দুই বিধায়ক কলকাতার একটি হোটেলে ৫০ জন বিদ্রোহী বিধায়ক নিয়ে আলাদা বৈঠক করেন, যা দলের ভাঙনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

অবশেষে বিদ্রোহী বিধায়কেরা তাদের স্বাক্ষরিত চিঠি বিধানসভার স্পিকারের কাছে তুলে দেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যয়কে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করার ঘোষণা করেন। জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা ও শিউলি সাহাকে ডেপুটি লিডার ও আখরুজ্জামানকে বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

এই অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তৃণমূল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বুধবার ঘোষণা করে পশ্চিমবঙ্গের সব সাংগঠনিক কমিটি ও সহযোগী-শাখা সংগঠনের কমিটিগুলো অবিলম্বে বিলুপ্ত করা হলো। এক বিবৃতিতে বলা হয়, পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো ঘোষণা করা হবে; জেলা থেকে বুথ স্তর পর্যন্ত সব সংগঠন পুনর্গঠন করা হবে। সিদ্ধান্তের সঙ্গে একটি আত্মসমালোচনা ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের প্রক্রিয়া চালুর কথাও বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত, এটি কেবল সাংগঠনিক রদবদল নয়—ক্ষমতা খোয়ার পর দলের পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব পুনর্বহাল করার একটি কৌশলও এটা। অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরকে নিয়ন্ত্রণে আনার কঠিন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, মমতা অতীতে কঠিন সময়গুলোতে দলের সাংগঠনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছেন; তবে এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল কারন ভোট হারে পরাজয়, বিধায়কদের বিদ্রোহ এবং নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন একসঙ্গে এসেছে।

দলীয় সূত্র থেকে বলা হচ্ছে, নতুন কাগজপত্র ও সংগঠনের পুনর্গঠন শেষে যাদের মাঠে সক্রিয়তা কম, যাদের দায়িত্ব মেয়াদীন ভঙ্গ, এবং কোথায় কোথায় সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে—সবকিছু খতিয়ে দেখা হবে। রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন, পুনর্গঠনের পরে তৃণমূল কতোটা ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে আসতে পারবে এবং বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে নেতৃত্বের সম্পর্ক কোন দিকে ওঠে।

প্রসঙ্গত, তৃণমূল এবারের নির্বাচনে ৮০টি আসনে জিতেছিল; দলত্যাগ-প্রতিরোধী আইনের আলোকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক বিধায়কের প্রয়োজন ছিল বলে আলোচনা ছিল। বুধবারের বৈঠকে যেখানে ঋতব্রতকে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, সেখানে ৫৯ জন বিধায়কের স্বাক্ষর ছিল এবং পরে আরও ছয়জন স্বাক্ষর করবেন বলে জানানো হয়। এখন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে খোলা প্রশ্ন হলো—এই বিভাজন দীর্ঘস্থায়ী হবে নাকি দ্রুত মিলিয়ে পুনরায় দলকে একত্রে আনা যাবে।