শুক্রবার, ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক প্রস্তাব: বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে অতিরিক্ত ট্যারিফের আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর (ইউএসটিআর) জোরপূর্বক শ্রম বা ফোর্সড লেবার সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে বা শ্রম মানদণ্ড বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত শুল্কের হার দেশভেদে ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে; বাংলাদেশসহ কিছু দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ইতোমধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বাণিজ্য চাপের অংশ হতে পারে এবং বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পে প্রভাব ফেলবে। ইউএসটিআরের বক্তব্য, জোরপূর্বক শ্রম ঠেকাতে বড় বাণিজ্য অংশীদাররা ব্যর্থ হলে তা মার্কিন শ্রমিকদের জন্য অন্যায় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে।

প্রস্তাবটি আসতে যাওয়ার পটভূমিও রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ চুক্তির কারণে রপ্তানিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কথাও আলোচনায় ছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে প্রশাসন বিকল্প শুল্ক কাঠামো খোঁজার দিকে ঝুঁকে এবং সেকশন-১২২ মতো বিধানের আওতায় নতুন তদন্ত ও পদক্ষেপ শুরু করে।

ইউএসটিআর বলেছে, তালিকাভুক্ত কয়েকটি দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে; তালিকায় আছে বাংলাদেশ, কানাডা, ইকুয়েডর, সকল ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্যরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়েতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও যুক্তরাজ্য। অপর দিকে তদন্তাধীন বাকি ৪৫টি দেশের ক্ষেত্রে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে; এতে চীন, ভারত, নাইজেরিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড রয়েছে।

ইউএসটিআর ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ জেমিসন গ্রির মন্তব্য করেছেন, জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্য আমদানির বিষয়টি রোধে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের ব্যর্থতা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা মার্কিন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অপ্রতুল প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রস্তাবিত শুল্ক ও অন্যান্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হবে — মন্তব্য সময়সীমা ৬ জুলাই পর্যন্ত, এবং ৭ জুলাই একটি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

প্রস্তাবে এমন কিছু খাত শুল্ক কাঠামোর বাইরে রাখা হয়েছে; যার মধ্যে জ্বালানি, বিরল খনিজ, নির্দিষ্ট ধাতু, গরুর মাংস, কফি, নির্দিষ্ট ফল ও সবজি, ওষুধ, জৈব রসায়ন ও বিমানের যন্ত্রাংশ রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব খাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সরবরাহশৃঙ্খলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এগুলো সরাসরি ট্যারিফের আওতায় আনা হয়নি।

এছাড়া ইউএসটিআর একটি টেক্সটাইল মেকানিজম চালুর প্রস্তাবও দিয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য তুলনামূলকভাবে কম শুল্কে আমদানি করা হতে পারে—তবে মেকানিজমের বিশদ শর্ত এখনও公開 করা হয়নি।

বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া মিশ্র হয়েছে। ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারক সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের পুরনো ট্যারিফ নীতি বাস্তবায়নের ভিন্ন প্রয়াস এবং আইনি পথে একই লক্ষ্য পুনরায় আনা হচ্ছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, মার্কিন আদালত আগের ট্যারিফ বাতিল করলেও এখন নতুন অজুহাতে ট্যারিফ আরোপের চেষ্টা হচ্ছে; তিনি দাবি করেন যে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জোর করে কাজ করানোর কোনো প্রমাণ নেই এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম কনভেনশনের কোর কনভেনশনগুলোর বেশিরভাগ অনুষঙ্গে রয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ট্যারিফ প্রয়োগ হিসেবেই দেখা যায়; তবে বাংলাদেশকে উচিত শ্রম অধিকার ও বাস্তবায়নকে আরও শক্ত করতে মনোযোগ দেওয়া, যাতে কোনো প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কম থাকে। তিনি মনে করেন, আমেরিকান নীতির বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জও উঠতে পারে।

বিদ্যমান প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সাধারণ মতামত ও গণশুনানি শেষে সিদ্ধান্তের চিত্র পরিষ্কার হবে; তা কার্যকর হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বিশেষত তৈরি পোশাক খাতকে কী প্রভাব পড়বে, সেই বিষয়ে বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের সতর্কতা বজায় রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা, রয়টার্স।