বৃহস্পতিবার, ১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জামায়াত পেশ করে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ‘জনমুখী ছায়া বাজেট’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জনকল্যাণমুখী এক বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ পেশ করেছে, যার আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। সংগঠনের বক্তব্যে বলা হয়েছে, এই বাজেটের লক্ষ্য হচ্ছে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ক্ষত সারিয়ে এক ইনসাফভিত্তিক, জনগণের পক্ষে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন।

মঙ্গলবার (৯ জুন) মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন এই ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেন। তিনি অনুষ্ঠানে বাজেটের মূল রূপরেখা ও নীতিগত উদ্দেশ্য তুলে ধরেন।

মিলন জানান, প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আয়-ব্যয়ের পরিসর ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক ঘাটতি বাজেটে ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ।

বিকল্প বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে জামায়াত সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা প্রদর্শন করছে বলে মিলন জানান। তিনি বলেন, ব্যয়ের ধার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং স্বাস্থ্যখাতকে প্রসারিত করার মতো নীতির প্রস্তাব রয়েছে।

বিগত শাসনামলের সমালোচনা করে মিলন দাবি করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত দেশ থেকে ব্যাপক অর্থপাচার হয়েছে এবং ব্যাংকব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলছেন, সেই পাচিত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনাই হবে বাজেট ঘাটতি মেটানোর অন্যতম উপায়।

ট্যাক্স ও প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে জামায়াতের প্রস্তাবনায় জাতীয় পরিচয়পত্রকে (এনআইডি) ভিন্ন টিন নম্বরের বদলে ‘বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে শক্তিশালী করবে বলে দাবি করা হয়েছে।

করপ্রণালী সংক্রান্ত প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান সাড়ে ৪ লক্ষ থেকে বাড়িয়ে ৫ লক্ষ টাকা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া করদাতাদের সন্তানদের শিক্ষা খরচ হিসেবে বছরে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং পরিবারের প্রতিজন সদস্যের জন্য মাথাপিছু আরও ৫০ হাজার টাকার কর রেয়াত দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

সামাজিক ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা বর্তমানে ৬৫০-৯০০ টাকা থেকে প্রথমত ১ হাজার টাকায় এবং পরবর্তী পর্যায়ে ধাপে ধাপে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্যও নির্দিষ্ট ভাতার প্রস্তাব রাখা হয়েছে — দেশের সকল মসজিদের ইমামরা পাবেন মাসিক ৭,৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিন ৫,০০০ টাকা এবং খাদেম ৩,০০০ টাকা।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রস্তাবের অংশ হিসেবে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

মাতৃত্বকালীন সেবার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, সন্তানের সম্ভাবনার শুরু থেকে সকল মায়ের জন্য মাতৃকালীন দুই বছর বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রস্তাব আছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রাসা সরকারি পর্যায়ে নেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে।

মিলন বলেন, গত শাসনে শুধুমাত্র জিডিপির সংখ্যাগত উন্নয়নের ওপর জোর থাকায় জনগণের প্রকৃত জীবনমান উন্নত হয়নি। ২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে সামনে রেখে তারা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। তিনি আরও বলেন, তাদের বাজেট প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয়, বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা নির্ভর হবে—স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদবণ্টনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্যে এগোবে।

জামায়াতের বক্তব্যে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদে সরকারি বাজেট পাসের আগে তাদের এই বিকল্প বাজেট জনগণের কাছে তাদের কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ভাবনা জানানোর একটি প্রচেষ্টা। সংগঠন আশা করছে, এই প্রস্তাবনা নীতিগত বিতর্ক ও জনসাধারণের আলোচনা জাগ্রত করবে।