শনিবার, ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দুর্বল ব্যাংক রক্ষায় সরকার ব্যয় করছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা

ঋণকেলেঙ্কারি ও আর্থিক সংকটে ঢলে পড়া ব্যাংকগুলোকে ‘দুর্বল’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালুর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে এসব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে।

বৃহস্পতিবার সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগ আহ্বান সচল রাখতে সরকারের মধ্যমেয়াদি কৌশলের মূল অগ্রাধিকার ‘ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা’ ফিরে আনা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব সংস্কার আর্থিক খাতের ওপর জনসাধারণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।

অর্থমন্ত্রী সংসদে আরও জানান, ‘দুর্বল ব্যাংকসমূহের আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং প্রয়োজনে পুনঃমূলধনীকরণ ও ব্যবস্থাপনা সংস্কার গ্রহণ করা হবে।’ তিনি একইসঙ্গে পুনর্গঠনের জন্য যে তহবিলের ব্যয় হচ্ছে তা উল্লেখ করে বলেন, এ জন্য চলতি অর্থবছরে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে।

সংসদে পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ২০০৫ সালে (বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে) সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ৭.৩ শতাংশ। সেখানে অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, লুটপাট ও ভুল নীতি গ্রহণের ফলে ধীরে ধীরে অবস্থা খারাপ হয়ে গত কয়েকবছরে তা ২০২৫ সালের শেষে ঋণাত্মক — মাত্র −২.৬৪ শতাংশে নামিয়ে এসেছে। তিনি আরও বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮.৩ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ সালে কমে ৬.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি শিল্পে লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও স্ক্যামের অভিযোগ তুলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুন্ন হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেন।

অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত কয়েকটি প্রধান ব্যবস্থা হলো:

১) খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহিতা জোরদার করা।

২) আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যাংক পুনর্গঠন উদ্যোগ নেওয়া।

৩) বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।

৪) ব্যাংক কার্যক্রমে রাজনৈতিক নিয়োগ ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করা; পারিবারিক প্রভাবমুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধন।

৫) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন পর্যাপ্ততা ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করা, যাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও প্রতিযোগীশীল হয়ে উঠতে পারে।

৬) আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়ে নারী, তরুণ উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, ঋণনির্ভর বিনিয়োগকে ধীরে ধীরে ইক্যুইটিতে রূপান্তর করে অর্থনীতিকে ঋণভিত্তিক অবস্থার বাইরে নিয়ে এসে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সরকারের লক্ষ্য।