সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জামায়াত পেশ করল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার জনমুখী ‘ছায়া বাজেট’

বিগত দুর্নীতি ও অর্থপাচার কাটিয়ে জনকল্যাণভিত্তিক একটি ন্যায়ের রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রধান শঙ্কু হিসেবে বাজেটে শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানোর নানা প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই ছায়া বাজেট পেশ করেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বাজেটের ভৌত পরিমাপ, রাজস্ব লক্ষ্য ও ঘাটতির পরিসংখ্যান বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন।

প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আয়তন ধরা হয়েছে মোট ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রেভিনিউ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। এতে ব্যয়ের সঙ্গে রাজস্বের পার্থক্য হিসেবে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

বৈষয়িক দিক থেকে জামায়াতের ছায়া বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ, করছাড় বাড়ানো, এবং ধর্মীয় কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধিসহ কর্মসংস্থান ও জনমুখী উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে দলটি সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত একটি আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের কথা তুলে ধরেছে।

প্রস্তাবনায় বৈধ পরিচয় ও কর শনাক্তকরণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রকে (এনআইডি) কর শনাক্তকরণ নম্বর হিসেবে ব্যবহার করার সুপারিশ করা হয়েছে—অর্থাৎ আলাদা টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) তৈরি না করে এনআইডিকেই ‘বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ হিসেবে গ্রহণ করা। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার প্রবর্তনের কথাও বলা হয়েছে।

করনীতি পরিবর্তনের প্রস্তাবে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা বর্তমানে সাড়ে ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি করদাতাদের সন্তানদের শিক্ষাব্যয়ের জন্য প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার কররেয়াত ও পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য মাথাপিছু আরও ৫০ হাজার টাকার অতিরিক্ত কররেয়াতের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বণ্টনে রি-ট্যাগিং করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত ভাতা বর্তমানে ৬৫০–৯০০ টাকার সীমা থেকে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করে প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব তুলেছেন প্রস্তাবকরা।

ধর্মীয় কর্মীদের সম্মানী বৃদ্ধিও বাজেটের দরকারি অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে—দেশের মসজিদের ইমামদের জন্য মাসিক ৭,৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫,০০০ টাকা এবং খাদেমদের ৩,০০০ টাকা করে ভাতা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথাও বাজেটে রাখা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন স্কেল ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

মাতৃত্বকালীন সেবায় বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে বলা হয়েছে—গর্ভধারণের সময় থেকেই সকল মায়ের জন্য দুই বছরের বিনামূল্যের প্রাথমিক মাতৃকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রস্তাব। শিক্ষাব্যয়ে জোর দিতে সরকারি বরাদ্দ বাড়াতে এবং প্রত্যেক জেলায় অন্তত একটি আলিয়া মাদ্রাসা সরকারিকরণ করার কথাও প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছে।

সাইফুল আলম খান মিলন পূর্ববর্তী শাসনামলের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, বিগত সময়ে সরকারি ব্যবস্থার দুর্নীতির ফলে ব্যাংকব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকার পাচার ঘটেছে—এই অর্থ ফিরিয়ে আনা হলে বাজেট ঘাটতি কাটানো সম্ভব হবে, দাবি তার।

তিনি আরও বলেন, তাদের প্রস্তাবিত বাজেট প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয়; বরং এটি সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতামুখী নীতির ওপর ভিত্তি করে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অদক্ষতা বিলোপ করে স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদবণ্টনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্যে তারা কাজ করতে চায়।

জামায়াত এই বিকল্প বাজেট সংসদে সরকারিভাবে বাজেট পাসের আগে জনগণের সামনে তাদের কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ভাবনা উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যেই পেশ করেছে, বলেছে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভাগীয় নেতারা।