সোমবার, ২২শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সিপিডি: প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্ন আয়ের করদায় সর্বোচ্চ সাড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ব্যক্তিগত আয়কর কাঠামোতে বৈষম্য দেখা যাচ্ছে — তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা বেশি বাড়ছে।

রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে অনুষ্ঠিত বাজেট পর্যালোচনা সংলাপে সিপিডি জানায়, নতুন করকাঠামোয় যাদের বার্ষিক করযোগ্য আয় ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে, তাদের করদায় বদল করে ১২.৫ থেকে ১৬.৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি চাপ পড়বে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, যারা বার্ষিক ৩০ লাখ টাকার বেশি আয় করেন তাদের ক্ষেত্রে করের দায় বৃদ্ধি মাত্র ৭.৬ শতাংশ—এটি সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। সম্মানিত ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম (জুনায়েদ সাকি) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।

বাজেট বিষয়ে অভিজ্ঞদের অংশগ্রহণও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, করযোগ্য আয়ের অনুপাতে করের বোঝা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর করের অতিরিক্ত চাপ পড়বে, যা সামাজিক সমতা ও ন্যায়নীতির বিরুদ্ধে। তিনি আরও যোগ করেন, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া ‘‘১৮ মাসে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান’’ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি প্রস্তাবিত বাজেটে পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট চারটি মন্ত্রণালয়ের (শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্প ও বাণিজ্য) বরাদ্দ মোট ব্যয়ের তুলনায় কমছে বা স্থবির থাকায় বাস্তবে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। পটুয়াখালী ইপিজেড, জামদানি ভিলেজের মতো কর্মসংস্থানমুখী বড় প্রকল্পগুলোও বছরের পর বছর স্থগিত রয়েছে বলে তিনি তুলে ধরেন।

তিনি সতর্ক করেন, সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং প্রয়োজনীয় নীতি-সংস্কার ছাড়া এই বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা হিসেবে থেকে যাবে।

বাজেট প্রস্তাবে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৩ শতাংশ—এই লক্ষ্য অর্জন করতে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিচক্ষণ মুদ্রানীতি প্রয়োগ করা অপরিহার্য বলে সিপিডি মত দিয়েছে।

জানানো হয়, ইতিবাচক দিক হিসেবে এ বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বরাদ্দের কার্যকরি বাস্তবায়ন নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে—নীতিগত অগ্রগতি থাকলেই যথাযথ বাস্তবায়ন না করলে প্রভাব সীমিত থাকবে।

সিপিডি’র উপস্থাপনা ও আলোচনায় ফলে উঠে এসেছে যে, বাজেট নীতি যদি সমাজের ভিন্ন আয়ের স্তরের ওপর বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং কর্মসংস্থান-বর্ধনের বাস্তব পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে তা টেকসই ও সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।