মঙ্গলবার, ২৩শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জুলাই রায় বাস্তবায়ন না হলে প্রস্তুত থাকুন — ‘আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব’ হবে: ড. শফিকুর রহমান

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান শনিবার খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ ময়দানে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে বলেন, জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় و ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে। যদি সংসদে এ বিষয়ে সমাধান না আসে তবে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে সরাসরি জনগণের সঙ্গে নিয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরবেন।

সমাবেশে তিনি বলেন, “যেখানে কথা বলতে স্পিকারের অনুমতি লাগে না, সেসব মাঠে-ময়দানে আমরা জনগণের সঙ্গে কথা বলব এবং গণজাগরণ সৃষ্টি করব।” যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, “জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে আপনারা ফ্যাসিবাদকে বিদায় জানিয়েছেন। প্রয়োজন হলে নব্য ফ্যাসিবাদকে বিদায় জানানোর জন্য আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়; এটি একজন উত্তরদায়ী, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সাংসদ মিয়া গোলাম পরওয়ার। প্রধান অতিথি ছিলেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে ছিলেন এনসিপি মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাঁচাওয়ারী, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) রাশেদ প্রধান, আমার বাংলাদেশ পার্টির এড. আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এড. এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁনসহ জেলা ও মহানগর নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সমাবেশ প্রারম্ভে কোরআন তেলাওয়াত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হয়। মূল সভা বিকেলে শুরু হলেও কর্মসূচির সূচনা থেকে দুপুর থেকেই সার্কিট হাউজ ময়দান জনসমুদ্রের রূপ ধারণ করে। আয়োজকরা জানায়, খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা থেকে পাঁচ সহস্রাধিক বাস, ট্রাক, ট্রেন ও ট্রলারে করে নেতাকর্মী ও সমর্থক এসেছিলেন। মিছিল-মিটিংয়ে দলীয় পতাকা, ব্যানার ও স্লোগান ছিল চোখে পড়ার মতো এবং শহরজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গিয়েছিল।

সমাবেশে মঞ্চ, লজিস্টিক ও অতিথি আসন সংক্রান্ত প্রস্তুতি মধ্যরাতে সম্পন্ন করা হয়; মঞ্চে ‘খুলনা বিভাগীয় সমাবেশ’ লেখা ব্যানার টানানো ছিল এবং প্রধান অতিথি ও আগত প্রতিনিধিদের জন্য আয়োজকরা আলাদা ব্যবস্থাও করেছিলেন।

ড. শফিকুর বলেন, দেশের মানুষ বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করে বদল চেয়েছিল, কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন যে, অতীতে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রতি বাধ্যবাধকতা রক্ষা করা হয়নি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ ও দুর্বলীকরণ করে জনগণের অধিকার ক্ষুণœ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা দেশে বিশৃঙ্খলা চাই না। কিন্তু অন্যায়, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে গৃহীত অবস্থান থেকে আমরা সরে আসব না।”

সীমান্ত পরিস্থিতি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, দেশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একসঙ্গে কাজ করবে; কোনো বিদেশি আধিপত্য বা আগ্রাসনের সামনে বাংলাদেশ মাথা নত করবে না।

সমাবেশে বক্তারা সরকারের প্রতি গণভোটে ব্যক্তিগত ও সাংবিধানিক সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যা ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরিত্যক্ত হচ্ছে; তাই গণভোটের ফলে যে সংস্কারের দাবী গঠিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা লক্ষণীয়। তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে সরকার কর্তৃত্ববাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

অংশগ্রহণকারীরা দাবি করেন যে, গণভোটের রায় প্রয়োগ, জনদুর্ভোগ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সমাধানসহ সামাজিক ও আর্থিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। সমাবেশ থেকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং বিরোধী জোট হিসেবে সংসদে ও মাঠে তাদের অবস্থান কায়েম রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়।

স্থানীয় পর্যায়ে জেলা-উপজেলা নেতারা বক্তৃতা করেন এবং তা বুধবারের মতো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সিগন্যাল হিসেবে দেখা হয়েছে। জামায়াতের যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক মোবারক হোসাইন বলেন, আল্লাহর অনুকম্পায় সমাবেশ সফল হয়েছে এবং খুলনার বিভিন্ন ইউনিট থেকে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি এটিকে জনসমুদ্রে পরিণত করেছে।

সমাবেশ শেষ পর্যায়ে বক্তারা জনগণের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং দেশের যুব সমাজকে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন।