মঙ্গলবার, ৩০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ব্যাংক হিসাব খোলায় আর টিআইএন বাধ্যতামূলক থাকবে না

জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে পাস হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ‘অর্থবিল ২০২৬’-এ ব্যাংক হিসাব খোলার সময় ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হবে না। এছাড়া সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মধ্যে জমি–ফ্ল্যাট বণ্টননামা, দলিল নিবন্ধন ও নামজারি করার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সংসদে সোমবার (২৯ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বাজেট প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে কণ্ঠভোটে অর্থবিল পাস করা হয়। পাসের সময় ও পরে আনা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীতে দেশের করনীতি ও প্রশাসনে ধ্রুবক পরিবর্তনের সংকেত মেলে।

একযোগে আনা এক বিধান ছিল প্রকৃত মূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনে বিশেষ সুযোগ রাখা—তবে সমালোচনার পরে সেই বিশেষ বিধান পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। সমালোচনায় বলা হয়েছিল, ওই সুযোগ কালো টাকা সাদা করার পথ খুলে দিতে পারে, তাই বিধানটি বিল থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ধার্য করা কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

প্রারম্ভিক প্রস্তাবে এমন একটি ‘দায়মুক্তি’ বা ইনডেমনিটি-ধারা ছিল, যার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ সরকারি কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বিনিয়োগ করা যাবে। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন মহল তীব্র সমালোচনা করেন; সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সহ অনেকে এর বিরোধিতা করেন। পরের সংশোধনীতে সরকার ওই ইনডেমনিটি প্রত্যাহার করে দিয়েছে। এখন থেকে কেউ অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করলে নিয়মিত করের সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা ভাড়া দিয়ে তা করতে পারবেন, এবং সেই অর্থের উৎস সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যে কোনো সময় প্রশ্ন তোলার আইনি অধিকার রাখবে—ফলে কালো টাকা সাদা করার বিশেষ ছাড় পাওয়া যাবে না।

সোনার উপর মূলধনী লাভ কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) বর্তমান ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। বাজেটের প্রস্তাবে সাধারণত সোনা, রুপা, গহনা, মূল্যবান পাথর, হীরা, মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা, শিল্পকর্ম, প্রাচীন নিদর্শন ও ক্লাব সদস্যপদ বিক্রয়/হস্তান্তর থেকে অর্জিত লাভকে মূলধনী লাভ হিসেবে ১৫ শতাংশ কর ধার্য করার প্রস্তাব ছিল। একইভাবে ট্রেজারি বিল, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, ডিবেঞ্চার, সুকুক ও অন্যান্য শরিয়াহভিত্তিক সিকিউরিটিজ এবং কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার-স্টক বিক্রির লাভেও ১৫ শতাংশ কর আরোপের ধারা প্রস্তাবিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সোনার উপর কর আরোপের এ ধরণ প্রয়োজ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছিল।

প্রস্তাবিত বাজেটে অনলাইন ভিডিওভিত্তিক সেবা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ধারিত ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা ডিজিটাল সার্ভিসে ভ্যাট চাপ সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার করের হার বৃদ্ধি করবে না; বরং করের আওতা বিস্তৃত করবে। তিনি জানান, করনীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা রাখা হবে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধে কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানো হবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

সংক্ষেপে, পাস হওয়া অর্থবিলে টিআইএন সংক্রান্ত কয়েকটি বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার এবং কিছু কর হার সংশোধনের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে; একই সঙ্গে কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করে তুলতে সরকারের দিক থেকে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।