জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সোমবার (২৯ জুন) ঐক্যবদ্ধ আবেদন জানান — সংসদকে তোষামোদী গান, কবিতা ও ব্যক্তিগত বন্দনা দিয়ে নষ্ট করার “ব্যাড কালচার” বন্ধ করতে হবে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বাজেট আলোচনায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, সংসদ কোনো তোষামোদের জায়গা নয়, এটি দায়িত্ব পালনের স্থান; জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যয়ে এখানে যেন আর চরিত্র হননের ঘটনা না ঘটে, এটাই তার স্পষ্ট বার্তা।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক; কোনো একমত হলে এতদিনের বক্তৃতার দরকারই ছিল না। আমরা সবাই জনগণের ভোটে আসি এবং আল্লাহর ইচ্ছায় এখানে দায়িত্ব পেয়েছি, তাই প্রত্যেকেই নিজেদের বিবেক, আল্লাহ ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
তিনি বাজেট অধিবেশনকে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেশন আখ্যা দিয়ে জানান, এর ভিত্তির ওপর পুরো বছরের কর্মপরিকল্পনা নির্ভর করে। সেই উপলক্ষ্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় নেতা ও গণআন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করেন — মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী, আ স ম আবদুর রবসহ স্বাধীনতার সংগঠক ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। ৯০-এর গণআন্দোলন, ২৮ অক্টোবর, পিলখানার বর্বর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর ও দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহীদ ও বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তিনি সম্মান জানান এবং পিলখানায় নিহত বীর সেনাদের জন্য দোয়া চান।
নিজের দলের অবস্থা ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, ‘‘আমরা এমন একটি দলের সদস্য যারা কষ্ট ভোগ করেছি; একে একে ১১ জন সিনিয়র নেতা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, আর এখন আমি সহ ক’জনই বেঁচে আছি।’’ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও প্রতিবন্ধীসহ ফ্যাসিবাদী শাসনের দুর্জনের শিকার পরিবারদের প্রতি তিনি সমবেদনা জানান।
বাজেটের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষনের বাইরে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বের উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি সংসদকে একটি যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করলেন — সরকার ও বিরোধী দল যেন দুই চাকা; এক চাকা অকেজো হলে পুরো যানবাহন বন্ধ হয়ে যাবে। তাই দুই পক্ষকেই সচল রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বললেন, ‘‘চাকায় পিন বা পেরেক মেরে ফুটো করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।’’
অন্যদিকে সংসদের অপ্রয়োজনীয় কুচকুচ করে কাটা বা পারফরম্যান্স-ভিত্তিক তোষামোদ বন্ধ করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মনোভাব গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি স্পষ্ট করেন, সরকারি ভালো উদ্যোগ হলে বিরোধী দল সেটি কেবল বিরোধিতার জন্যই খারিজ করবে না, তেমনি বিরোধী দলের যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাবে সরকার আমলালেপে গ্রহন করবে। দুইপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার আহ্বান তার বক্তব্যের অন্যতম মূল কথা ছিল।
অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ডা. শফিকুর বলেন, সীমিত সময়ে বিধ্বস্ত অর্থনীতির ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট করা কঠিন ও গুরুভার কাজ ছিল—তবে এতে কিছু খুঁত থাকেই। বিরোধীদলের কাজ হলো ‘‘ওয়াচডগ’’ হয়ে বাজেটের যে কোথাও জনকল্যাণ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, অনর্থক ব্যয় হচ্ছে বা কেউ ন্যায্যাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কিনা তা তীক্ষ্ণভাবে দেখা।
বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাবও তুলে ধরেন তিনি। দেশে জুলাই-জুন অর্থবছর থাকায় বছরের শেষের দিকে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাড়াহুড়ো করে কাজ করার ফলে অপচয় বাড়ে; প্রথম ১০ মাসে কাজ মাত্র ৪২ শতাংশ হলে শেষ সময়ে হুট করে কাজ করতে গিয়ে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। এজন্য তিনি বাংলাদেশে ক্যালেন্ডার ইয়ার (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) ভিত্তিক অর্থবছর গ্রহণ করার জোরালো প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাজেট সংসদে পাস হলেও এর বাস্তব বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাহীদের ওপর থাকে বলেও মনে করিয়ে দিয়ে তিনি সরকারের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে জনগণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের দাবি জানান। পাশাপাশি সম্পূরক বাজেট এবং কাটমোশন-আদিবিষয়ক প্রথার সমালোচনা করে আশা প্রকাশ করেন যে এবার যৌক্তিক প্রস্তাবগুলো অর্থমন্ত্রী প্রয়োজনীয় সংশোধন করে গ্রহণ করবেন, যাতে এই বিতর্ক শুধুমাত্র সময়ের অপচয় হিসেবে দেখা না যায়।
শেষে তিনি পুনরায় অত্যাবশ্যকীয় অনুরোধ জানান—সংসদ যেন আর তোষামোদের মঞ্চে পরিণত না হয়, এখানে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে; সংসদকে মানুষের আশা ও ঐক্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে এটি ন্যায্যতার প্রতীক হয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।





