ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলা বাণিজ্যিক জাহাজে ভারতীয় নাবিক মোতায়েন ও নিয়োগ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে ভারতের জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। গত তিন দিনে পৃথক দুটি হামলায় দুই ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার পরে এই কড়াকড়ি নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৬ জুলাই) ডিরেক্টরেট জেনারেল অব মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিজিএমএ) এক আদেশ জারি করে জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় ওই অঞ্চল অতিক্রমকারী জাহাজে ভারতীয় নাবিকদের পাঠানো হবে না—পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত। আদেশে দেশজুড়ে সব জাহাজ মালিক, নৌ ব্যবস্থাপক এবং নাবিক নিয়োগকারী সংস্থাগুলোকে এ নির্দেশ মানতে বলা হয়েছে।
ডিজিএমএর নির্দেশে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগর ও সংলগ্ন জলসীমায় চলাচলকারী ভারতীয় জাহাজের ক্যাপ্টেনদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আন্তর্জাতিক নৌনিরাপত্তা নির্দেশিকা (ISPS) কঠোরভাবে অনুসরণ করা, জরুরি সহায়তার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ও সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পটভূমি হিসেবে বলা যায়, ভারত বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম নাবিক সরবরাহকারী দেশ—বিভিন্ন দেড়শতক জাহাজে বর্তমানে প্রায় ৩ লক্ষাধিক ভারতীয় নাবিক কর্মরত রয়েছেন। জাতিসংঘের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ১ মার্চ থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী সংঘাতজনিত ঘটনার কারণে ১৬ জন নাবিক নিহত হয়েছেন; এদের মধ্যে ৭ জন ভারতীয়, অর্থাৎ মোট নিহতের প্রায় ৪৪ শতাংশ ভারতীয় নাবিক।
প্রায়তম বিস্তৃতি ঘটনার সারি অনুযায়ী, মার্চের শুরুর দিকে ওমান উপকূলে মার্শাল আইল্যান্ডস পতাকাবাহী ‘এমকেডি ব্যোম’ জাহাজে হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত হন। জুনের ৮ থেকে ১১ জুনের মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর অভিযানে কিছু ট্যাঙ্কারে আঘাত হলে এমটি মারিভেক্স, এমটি সেত্তেবেলো ও এমটি জালভির নামের জাহাজগুলোতে হামলার খবর আসে; ওই সময় তিনজন ভারতীয় নাবিকের প্রাণহানি ঘটে।
এরপর ১২ জুলাই সাইপ্রাস পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ ‘জিএফএস গ্যালাক্সি’তে হামলায় পুনের ৩০ বছর বয়সী মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হেরম্ব কর্মকার নিহত হন। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনার মধ্যে ১৪ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘এমটি মম্বাসা’তে ইরানি ক্রুজ মিসাইল হামলায় বিহারের ৩১ বছর বয়সী নাবিক রোহান কুমার প্রাণ হারান—এসব মিলিয়ে গত তিন দিনে দুই ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
নয়াদিল্লি এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানায় এবং ইরানের উপ-রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করেছে। সরকার এই ঘটনার তদন্ত দাবি করে এবং দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে। উল্লেখ্য, আগেও মার্কিন হামলার ক্ষেত্রে ভারত সরকার কেবল নিন্দা জানিয়েছে; এবার পরিস্থিতির জটিলতা ও নাবিকদের ওপর সুনির্দিষ্ট হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
ডিজিএমএর এই নির্দেশের প্রয়োগ কবে পর্যন্ত থাকবে তা এখনও নির্ধারিত নয়—পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ভারতীয় নাবিকদের হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী যেকোনও বাণিজ্যিক জাহাজে নিয়োগ করা যাবে না।





