রবিবার, ১৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জুলাই শহিদদের স্বপ্নে বৈষম্যহীন গণতন্ত্র গড়তে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

জুলাই আন্দোলনে শহিদ হওয়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ’১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের দ্বিতীয় শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার (১৮ জুলাই) খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের কেন্দ্র ছিল লিয়াকত আলী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘‘জুলাই বিপ্লব থেকে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’’ শীর্ষক আলোচনা সভা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) চেয়ারম্যান এ্যাড. এস এম শফিকুল আলম মনা, খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন, শহিদের পিতা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহিদ সাকিব রায়হানের পিতা শেখ আজিজুর রহমান, উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ হারুনর রশীদ খান ও ট্রেজারার প্রফেসর ড. মোঃ নূরুন্নবী। দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও ছাত্র বিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. মোঃ নাজমুস সাদাত স্বাগত বক্তৃতা দেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা আগস্টের ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং জুলাই শহিদদের আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে বলেন, তাদের স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক একটি বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা সততা, সাহস ও দেশভক্তি বজায় রেখে যুবসমাজকে সেই আদর্শ বহন করতে বলেন।

অনুষ্ঠানে গণিত বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মোঃ আজমল হুদা ও আইন বিভাগের ’১৯ ব্যাচের আল শাহরিয়ার ও গণিত বিভাগের ’২২ ব্যাচের জাহিদুল ইসলামসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অনুভূতি ও স্মৃতিচারণ করেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে প্রস্তাবিত অনানুষ্ঠানিক দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খানকে প্রদান করা হয়।

উৎসবের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ভবনের পাশে জামে মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম ক্বারী মুস্তাকিম বিল্লাহ কোরআনের তেলাওয়াত করে শহিদ ও আহতদের জন্য দোয়া পরিচালনা করেন। আলোচনা সভায় শহিদের পরীক্ষার সনদ মীর মুগ্ধের পিতাকে তুলে দেওয়া হয় এবং শহিদ মীর মুগ্ধ ও শহিদ সাকিব রায়হানের পরিবারকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে আহতদের সম্মাননা স্মারকও প্রদান করা হয়।

প্রতিদিনের কর্মসূচির শুরুতেই সকালে অদম্য বাংলা চত্বরে জুলাই আন্দোলনের স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। অতিথিবৃন্দ প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন এবং পরে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, ডিসিপ্লিন প্রধান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক সংগঠন ও সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্বসভার বিশেষ অতিথি সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনকে অবসান ঘটিয়েছে। আন্দোলনের যে চেতনাই—বাকস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র—তাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যতে নতুন করে ফ্যাসিবাদী শাসন গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য জুলাই সনদ ও হ্যাঁ ভোটের রায় বাস্তবায়ন জরুরি। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নতুন আবাসিক হল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তায় তিনি সমর্থন ও সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে জমি অধিগ্রহণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

কেডিএ চেয়ারম্যান এ্যাড. এস এম শফিকুল আলম মনা মীর মুগ্ধের আত্মত্যাগকে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান শিক্ষা কেন্দ্র; এর অবকাঠামো সম্প্রসারণে মৎস্য ভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্তির দাবি তিনি জানান এবং শহিদের নামে আবাসিক হল ও মেইন গেটের নামকরণের উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য জুলাইযোদ্ধাদের সংখ্যা ও ইতিহাস সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিতর্ক না তৈরি হয়। তিনি মীর মুগ্ধ’র আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে ন্যায় ও দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত করবে বলে উল্লেখ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার প্রকৃত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার আহ্বান জানান।

বিসিবি পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, ব্যক্তিগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মীর মুগ্ধ মাঠে নেমে মানুষের পানির ব্যবস্থা করেছিলেন; আন্দোলনে সেই ত্যাগের ফলে তিনি শहीদ হন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জুলাই শহিদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছে—আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে—তবে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে যাতে শহিদদের লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়।

অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নেতৃবৃন্দ শহিদদের আত্মত্যাগকে প্রতিষ্ঠার প্রতিষেধক হিসেবে মনে রেখে তাদের স্বপ্নের একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মোঃ নাজমুস সাদাত বলেন, শহিদদের ত্যাগ আমাদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে—নতুন প্রজন্ম তাদের আদর্শ ধরে আগলে রাখলেই শহিদদের স্বপ্ন সত্যি হতে পারে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালক মোঃ মতিউর রহমান ও কানিজ ফাতিমা খুশি। দিবসটি উপলক্ষে বাদ মাগরিব কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দোয়া ও স্মরণসভাও আয়োজন করা হয়।