বুধবার, ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আরাফাতে লাখো হাজি: ‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখর পবিত্র প্রান্তর

পাপমোচন ও আত্মশুদ্ধির আরাধনায় পবিত্র হজ পালন করছেন সাত সমুদ্র পেরিয়ে আসা ১৫ লাখেরও বেশি মুসলমান। মঙ্গলবার (২৬ মে) সূর্যোদয়ের পর থেকে লাখো হাজি মিনা থেকে আরাফাতের বিশাল ময়দানের দিকে রওনা হন — ট্রেন, বাস কিংবা পায়ে হেঁটে তারা একে একে জড়ো হচ্ছেন সেখানে।

আসাধারণ এক ঐক্যবদ্ধ দৃশ্যের সৃষ্টি হয়; হাজার হাজার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক—ইন্নাল হাম্দা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্‌ক, লা শারিকা লাক।’ এর অর্থ— “আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির; তোমার কোন شریک নেই; সব প্রশংসা ও নিয়ামত, রাজত্ব তোমারই।”

প্রচণ্ড রোদের তপতাপে ও গরম উপেক্ষা করে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাজিরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন; একভাবে দিনব্যাপী আল্লাহর স্মরণ, কোরআন পাঠ, নফল দোয়া ও মননে আত্মসমর্পণে তারা রত থাকবেন।

আরাফাত বা আরাফাহ ময়দানটি তিন দিকে পাহাড়বেষ্টিত এক বিশাল সমতল প্রান্তর; দৈর্ঘ্য প্রায় দুই মাইল ও প্রস্থও প্রায় দুই মাইল। ময়দানের একটি খ্যাতনামা স্থান জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়—প্রভুত্ত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান, যেখানেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ ঘোষণা করেছিলেন।

হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা আরাফাতে হাজিরা অবস্থান করা—ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফরজ পালনের অংশ। গতকাল থেকে শুরু হওয়া আচার-অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে মিনা নামক তাঁবুর নগরে অবস্থান নিয়েছিলেন লাখো হাজি; মিনার তাঁবুগুলো প্রায় আট কিলোমিটার দূরে হলেও সেখানকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুতে তারা বিশ্রাম নিয়ে গতকাল সন্ধানী ইবাদতে ব্যস্ত ছিলেন। মঙ্গলবার ফজরের নামাজের পর তারা আরাফাতের পথে রওনা হন।

আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত নামিরা মসজিদ থেকে আজ হজের খুতবা দেওয়া হবে। এবারের খুতবা ও নামাজ পরিচালনা করবেন নবীর প্রবীণ ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। খুতবা ও নামাজের মধ্যেই হাজিরা সারাদিন কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-উজকার, দোয়া ও মনোনিবেশে থাকবেন।

ধর্মীয় বিধান মোতাবেক আরাফাতের দিন কেবল দোয়া ও তওবা করার গুরুত্ব অনেক বেশি; হাজিরা জোহর ও আসর নামাজ একসঙ্গে (জমা’ ও কসর) আদায় করেন। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়লে তারা কাতর স্বরে আল্লাহর কাছে বিনীত দোয়া করেন, নিজের পাপের ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং পরিবারের জন্য, উম্মাহর জন্য, দেশের জন্য বিশেষ ইন্তিহা-মামুরু দোয়া করেন।

হাদিসে আরাফাহর দিনের গুরুত্বের বর্ণনা আছে—অন্য কোনো দিনে যেভাবে আল্লাহ তার বান্দাদের পাপমুক্ত করেন, সেভাবে আরাফাহর দিনে তিনি অতিরিক্ত দয়া-রহমত বর্ষণ করেন। ফলে হাজিরা এই দিনটিকে পুরোটা আত্মসমর্পণ ও তওবার দিনে রূপান্তরিত করেন।

আরাফাতের পর হাজিরা মুজদালিফায় প্রস্থান করবেন—খোলা আকাশের নিচে সেখানে রাতে থাকা ওয়াজিব। ফজরের নামাজের পর তারা সাতটি পাথর সংগ্রহ করবেন; এরপর ১০ জিলহজে মুজদালিফা থেকে ফিরে মিনায় বড় শয়তানকে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করা, পশু কোরবানি এবং মাথা ছাঁটা—এসব ক্রিয়ার মধ্যদিয়ে হজযাত্রার পরবর্তী কর্মসূচি এগিয়ে চলে। তাঁরা ইহরাম খুলে স্বাভাবিক পোশাক পরবেন এবং মক্কায় কাবার সামনে সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাঈ (সাতবার তাহার সাথে দৌড়ানো) ও তাওয়াফ আল-ইফাদাহ পালন করবেন।

তারপর মিনায় ফিরে ১১ ও ১২ জিলহজ অবস্থান করে প্রতিদিন তিনটি (ছোট, মধ্য ও বড়) শয়তানকে মোট ২১টি পাথর নিক্ষেপ করা হবে। কোরবানি শেষে অনেক হাজি নিজ হাতে বা বিশ্বস্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে পশু জবাই করে কোরবানি সম্পন্ন করবেন; কেউ কেউ ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের মতো সংস্থায় অর্থ জমা দিয়ে কোরবানি করান।

এভাবেই কাবা তাওয়াফ, আরাফাতে অবস্থান, সাফা-মারওয়ার মধ্যে সাঈ, মিনার জামারায় পাথর নিক্ষেপ ও কোরবানি—এই সমগ্র ইবাদত মিলে পবিত্র হজ পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পৃথিবীর নানা অঞ্চল থেকে আসা নানা ভাষাভাষী মুসলিমদের এই মিলন আর চোখে ঝরানো একেকজন হাজির হৃদয়ের গহীনে কোরবানি ও তওবার অঙ্গীকার জাগিয়ে তোলে।