দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ আরও তীব্র হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ (শ্রেণিকৃত ঋণ) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকায়; যেটি গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা — গত বছরের মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।
এই চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৬ ভিত্তিক শ্রেণিকৃত ঋণ ও প্রভিশন সম্পর্কিত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা; ডিসেম্বর শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ফলে এক প্রান্তিকে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একই সময়ে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের হার ডিসেম্বরের ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে মার্চে ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে হার বেড়ে ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ দশমিক ১১ শতাংশে, বিদেশি ব্যাংকে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশে এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ থেকে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশে উঠেছে।
পরিমাণভিত্তিক ভাঙচুরে দেখা গেছে—মার্চ শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মোট শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যা ডিসেম্বরের তুলনায় বাড়ানো। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯ লাখ টা থেকে বেড়ে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮১ কোটি ৮২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণ ২ হাজার ৯৮৩ কোটি ৭৭ লাখ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ২৬২ কোটি ৭৬ লাখ টাকায় উঠেছে। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে তা ১৮ হাজার ৫৪৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১৯ হাজার ১৭৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আরেক দিক থেকে দেখা যায়, মার্চ শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৫ দশমিক ২১ শতাংশ, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ৪৩ শতাংশের কিছু বেশি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ২৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকে ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ হয়েছে।
পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ আছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে — মার্চ শেষে তাদের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭০৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বিদেশি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ রয়েছে ২ হাজার ৬৯৫ কোটি ৯২ লাখ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ১৭ হাজার ৬৪৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করেছে যে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণ বাড়লেও একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে চলেছে। মার্চ ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরে মোট ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ; তবুও খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধির সঙ্গে প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বেড়েছে। ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও তহবিল যোগানোতে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে যাতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়।





