অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ঋণ কেলেঙ্কারি ও আর্থিক সংকটে জর্জরিত কয়েকটি ব্যাংককে ‘দুর্বল’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব করেছেন। তিনি জানান, এমন ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের মধ্যমেয়াদি কৌশলের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে দেশীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগ প্রবাহ সচল রাখা—তার অন্যতম উপায় ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে খাতে আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দুর্বল ব্যাংকসমূহের আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কার্যকর করা হবে এবং প্রয়োজন হলে পুনঃমূলধনীকরণ ও ব্যবস্থাপনা সংস্কার গ্রহণ করা হবে। এই কাজের খতিয়ান হিসেবে তিনি শিক্ষণীয় হিসাব-নিরিখে জানান যে ২০০৫ সালের পরে ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত কমে গেছে—২০০৫ সালে এটি ৭.৩ শতাংশ ছিল, কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে তা নেমে এসেছে ২.৬৪ শতাংশে। একই সঙ্গে তিনি বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও উল্লেখ করেন, যা ২০০৫-০৬ সালে ১৮.৩ শতাংশ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা এবং ভুল নীতির কারণে পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস পেয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করেই আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে।
অর্থমন্ত্রীর তুলে ধরা প্রধান প্রস্তাবগুলো হলো:
১. খেলাপি ঋণ হ্রাসে কাজ করা, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহিতা জোরদার করা।
২. আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যাংক পুনর্গঠন ও পুনমূলধনীকরণ উদ্যোগ গ্রহণ।
৩. বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।
৪. ব্যাংকের কার্যক্রমে রাজনৈতিক নিয়োগ ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করা; পারিবারিক প্রভাবমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করা।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়ে নারী, তরুণ উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজতর অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করাও সরকারের পরিকল্পনার অংশ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য বর্তমান ঋণভিত্তিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করা।





